রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্তের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের বক্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে। মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে ডাকাতির উদ্দেশ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করেছিল পুলিশ। পরে নিহত পরিবারের স্বজনেরা বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবির একটি ঘটনার কথা জানান। তবে সর্বশেষ রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ দাবি করেছে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।
শনিবার রাতে মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাড়িটির মূল ফটকে তালা ঝুলছিল। ভেতর থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। পরে কোতোয়ালি থানা-পুলিশ বাড়িতে গিয়ে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল, ডাকাতির উদ্দেশ্যে বাড়িটিতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে। বাড়ির ভেতরের মালামাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা, টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার রাখার স্থান ভাঙচুর এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়ার কারণে তদন্তকারীদের এমন ধারণা তৈরি হয়। তখন পুলিশ জানিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডটি দুই থেকে তিন দিন আগে ঘটে থাকতে পারে এবং চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
দোতলা বাড়িটির ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ পাওয়া যায় সিঁড়িতে। আর ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ ছিল শোবার ঘরের খাটের নিচে। পরে ভোরের দিকে চারজনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
মরদেহ উদ্ধারের পর রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছিলেন, নিহতদের সবার গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। ঘরবাড়ি তছনছ থাকায় প্রাথমিকভাবে ডাকাতির সম্ভাবনা সামনে এলেও তদন্তে অন্য বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছিল।
এরই মধ্যে নিহত পরিবারের স্বজনেরা বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবির অভিযোগ সামনে আনেন। গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর ভাষ্য, বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদার টাকা নিয়ে একটি বিরোধ হয়েছিল। তাঁর সন্দেহ, সেই বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।
গোপীনাথ জানান, পরিবারের চার সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা না গেলে তাঁদের ব্যবহৃত চারটি মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বাড়ির মূল ফটকেও তালা ছিল এবং ভেতর ছিল অন্ধকার। পরে স্থানীয় একজনকে বাড়িতে খোঁজ নিতে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে তার আগেই স্বজনেরা বাড়িতে গিয়ে মরদেহ দেখতে পান।
তবে তখন পুলিশ চাঁদা দাবির ঘটনাকে হত্যার কারণ হিসেবে নিশ্চিত করেনি। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ডাকাতির সম্ভাবনাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছিল।
পুলিশের নতুন বক্তব্য
রোববার দুপুরে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নতুন তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় মাছুয়াপাড়া এলাকার মুগ্ধ দাস, ২৩, এবং সিদ্ধার্থ দাস, ১৯, নামের দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতিকে হত্যা করা হয়। এরপর পরিবারের অন্য তিন সদস্যকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
হত্যার পর ওই দুজন বাড়িটির বাথরুমে গোসল করেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ। পরে তাঁরা খাবার টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করেন বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে। এরপর বাড়ি থেকে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বের হয়ে সেগুলো একটি পরিত্যক্ত স্থানে লুকিয়ে রাখা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আটকের পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই স্থান থেকে স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধারের কথা সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে।
ডাকাতির দৃশ্য সাজানোর অভিযোগ
পুলিশের সর্বশেষ বক্তব্যে বলা হয়েছে, তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ির মালামাল ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করা হয়েছিল। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেও বাড়িটিকে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে ঘটনাটি ডাকাতির মতো মনে হয়।
এ ছাড়া আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে দুটি মুঠোফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও পুলিশ দাবি করেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে হত্যার প্রকৃত কারণ আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, কিংবা আটক দুজনের বাইরে আরও কেউ জড়িত কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তাঁদের দেওয়া তথ্য ও উদ্ধার হওয়া আলামত যাচাই করা হচ্ছে।
নিহতদের পারিবারিক ও পেশাগত পরিচয়
গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি নিজ বাড়িতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
চারজনের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে একাধিক বক্তব্য সামনে এসেছে। প্রথমে পুলিশের পক্ষ থেকে ডাকাতির সম্ভাবনার কথা বলা হয়। পরে স্বজনেরা বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবির বিরোধের কথা জানান। সর্বশেষ পুলিশ ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যার মূল কারণ হিসেবে দাবি করেছে।
ফলে মামলার তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—পুলিশের সর্বশেষ দাবির সঙ্গে উদ্ধার হওয়া আলামত ও আটক ব্যক্তিদের বক্তব্য কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পুলিশ জানিয়েছে, সব দিক বিবেচনায় নিয়েই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।









