খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ৬:৪৬ পিএম

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার আগামীকাল সোমবার (২২ জুন) পদত্যাগ করতে পারেন এবং তার বিদায়ের একটি সময়সূচি নির্ধারণ করতে পারেন বলে দেশটির শীর্ষস্থানীয় রবিবাসরীয় সংবাদপত্রে-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে ডাউনিং স্ট্রিটের (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) একটি সরকারি সূত্র এই প্রতিবেদনটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সূত্রটি জানিয়েছে, স্টারমার পদত্যাগের কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, বরং তিনি এই মুহূর্তে দেশের শাসনকার্য পরিচালনা ও নিজের দায়িত্ব পালনের দিকেই সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করে আছেন।
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর গত কয়েক মাস ধরেই ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরে তীব্র অসন্তোষ ও চাপ তৈরি হচ্ছিল। তবে এই রাজনৈতিক সংকট গত শুক্রবার (১৯ জুন) নাটকীয় ও তীব্র রূপ ধারণ করে। ওই দিন অনুষ্ঠিত সংসদীয় উপনির্বাচনে মেকারফিল্ড (Makerfield) আসন থেকে স্টারমারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তথা গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বিদায়ী মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেন। এই জয়ের মাধ্যমে বার্নহ্যাম হাউজ অব কমন্সে (সংসদে) প্রবেশ করার আনুষ্ঠানিক যোগ্যতা অর্জন করেছেন, যা তাকে আইনগতভাবে দলের নেতৃত্বের জন্য স্টারমারের বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ বা অনাস্থা জানানোর পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, লেবার পার্টির কোনো নেতাকে দলের শীর্ষ পদে চ্যালেঞ্জ করতে হলে তাকে অবশ্যই সংসদের নির্বাচিত সদস্য হতে হয়। এই উপনির্বাচনটি মূলত অনুষ্ঠিতই হয়েছিল লেবার পার্টির বিদায়ী এমপি জশ সাইমন্সের পদত্যাগের কারণে, যিনি বার্নহ্যামকে জাতীয় রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ করে দিতেই নিজের আসনটি ছেড়ে দিয়েছিলেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, লেবার পার্টির ১০০ জনেরও বেশি নির্বাচিত আইনপ্রণেতা—যা হাউজ অব কমন্সে লেবার পার্টির মোট প্রতিনিধির প্রায় এক-চতুর্থাংশ—ইতিমধ্যেই প্রকাশ্য বা পরোক্ষভাবে স্টারমারের পদত্যাগ অথবা তার বিদায়ের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। অতি সম্প্রতি ক্যাবিনেট মন্ত্রী, রাজনৈতিক উপদেষ্টা, দলীয় দাতা এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার পর স্টারমার নিজেই বুঝতে পেরেছেন যে তার অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, স্টারমার তার চেকার্স (Chequers) গ্রামীণ সরকারি বাসভবনে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে এই বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা করছেন এবং সোমবারই তিনি একটি পরিষ্কার বিবৃতি দিতে পারেন।
লেবার পার্টির বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের ফলাফল নিচে টেবিলের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হলো:
| রাজনৈতিক সূচক ও বিষয় | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী | স্যার কিয়ার স্টারমার (লেবার পার্টি) |
| সম্ভাব্য পদত্যাগের তারিখ | ২২ জুন ২০২৬ (সোমবার) — প্রতিবেদন অনুসারে |
| প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী | অ্যান্ডি বার্নহ্যাম (নবনিযুক্ত এমপি, মেকারফিল্ড) |
| মেকারফিল্ড উপনির্বাচন (১৯ জুন) | অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ৫৪.৮% ভোট পেয়ে বিজয়ী (ভোট সংখ্যা: ২৪,৯২৭) |
| নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী (রিফর্ম ইউকে) | রবার্ট কেনিয়ন ৩৪.৫% ভোট প্রাপ্ত (ভোট সংখ্যা: ১৫,৬৯৬) |
| সংসদীয় আসন জয়ের ব্যবধান | ৯,২৩১ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বার্নহ্যামের জয় |
| স্টারমারের বিরুদ্ধে দলীয় অসন্তোষ | প্রায় এক-চতুর্থাংশ (১০০ জনের বেশি) লেবার এমপি তার বিদায় চান |
| ডাউনিং স্ট্রিটের আনুষ্ঠানিক অবস্থান | পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান; স্টারমার দায়িত্বে বহাল আছেন |
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে এক বিশাল ও ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়েছিলেন কিয়ার স্টারমার। তবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে একাধিক নীতিগত পরিবর্তন (U-turn) এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিতর্কের কারণে জনগণের মাঝে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পায়। ভোটারদের একটি বড় অংশের ধারণা তৈরি হয়েছে যে তিনি জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন।
তবে তীব্র চাপের মুখেও কিয়ার স্টারমার নিজে কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র নন। শুক্রবার লন্ডনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা দিয়েছেন যে, যদি দলে নেতৃত্বের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা চ্যালেঞ্জ আসে, তবে তিনি অবশ্যই নির্বাচনে দাঁড়াবেন এবং লড়াই করবেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “আমি কোনো অবস্থাতেই মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যাব না।” একই সাথে তিনি লেবার পার্টিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে নিজেদের ধ্বংস না করার আহ্বান জানান।
যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমার যদি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন বা দল থেকে অপসারিত হন, তবে গত এক দশকের মধ্যে ব্রিটেন তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবে। এটি গত দুই শতাব্দীর মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে সরকারপ্রধান পরিবর্তনের এক নজিরবিহীন রেকর্ড সৃষ্টি করবে, যা দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাকে এক বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাবে।
মন্তব্য