ভারতে বিমা বিতরণব্যবস্থায় প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে ভুল বা অনুপযুক্তভাবে বিমা বিক্রির জন্য সংশ্লিষ্ট বিক্রয়কর্মীকে আর্থিক দায়ের মুখে পড়তে হতে পারে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় ভুলভাবে বিক্রি করা পলিসির বিপরীতে দেওয়া কমিশন ফেরত নেওয়ার বিধান বা ‘কমিশন ক্ল-ব্যাক’ চালুর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কোন ব্যক্তি নির্দিষ্ট পলিসি বিক্রি করেছেন, সেটিও নথিভুক্ত রাখার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রয়েছে।
একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ফলে নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি মূল্যের জীবনবিমা বিক্রির ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রয়োজন ও পণ্যের উপযোগিতা যাচাইয়ের লিখিত নথি রাখা বাধ্যতামূলক হতে পারে। অর্থাৎ, শুধু গ্রাহকের সম্মতি নেওয়া হয়েছে—এমন যুক্তি দেখিয়ে অনুপযুক্ত পণ্য বিক্রির দায় থেকে বিক্রেতা নিজেকে অব্যাহতি দিতে পারবেন না।
প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো পলিসি ভুলভাবে বিক্রি হয়েছে বলে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পলিসির বিপরীতে দেওয়া কমিশন ফেরত নেওয়া হতে পারে। প্রতিটি পলিসির সঙ্গে বিক্রয়কর্মীর কার্যকর পরিচয় বা পরিচিতি যুক্ত রাখার ব্যবস্থাও প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো বিক্রয়কর্মীর মাধ্যমে ভুল বিক্রির ঘটনা ঘটলে তা তাঁর কর্মদক্ষতার রেকর্ডের অংশ হিসেবে প্রকাশ্যেও আনা হতে পারে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় ভুলভাবে বিমা বিক্রির ১২টি নির্দিষ্ট উদাহরণ চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের আমানতের বিকল্প হিসেবে নন-পার্টিসিপেটিং বিমা পণ্য বিক্রি, ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক বা কর্মজীবনের পরবর্তী বয়সে থাকা গ্রাহকদের কাছে ইউনিট-লিঙ্কড বিমা পরিকল্পনা বা ইউলিপ বিক্রি এবং নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা নেই এমন গ্রাহকের কাছে নিয়মিত প্রিমিয়ামের পণ্য বিক্রির মতো পরিস্থিতি রয়েছে। উত্তরাধিকার পরিকল্পনার জন্য জীবনবিমা পণ্য বিক্রিকেও প্রস্তাবিত ভুল বিক্রির উদাহরণের মধ্যে রাখা হয়েছে।
এই পরিবর্তনগুলো মূলত বিমা বিক্রির ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রয়োজন, পণ্যের উপযোগিতা এবং বিক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। প্রস্তাবের পেছনে বিমা খাতে বিতরণ ব্যয় ও বিক্রয়-প্রণোদনা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনাও রয়েছে।
বিশ্লেষণে বিভিন্ন জীবনবিমা করপোরেট এজেন্টের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে নতুন ব্যবসার প্রিমিয়াম ৬৩০ বিলিয়ন রুপি থেকে বেড়ে ৮০০ বিলিয়ন রুপি হয়েছে। অর্থাৎ, এই সময়ে তা প্রায় ১.৩ গুণ বেড়েছে। একই সময়ে এজেন্টদের পারিশ্রমিক ৯৬ বিলিয়ন রুপি থেকে বেড়ে ২১৬ বিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে, যা প্রায় ২.৩ গুণ বৃদ্ধি।
ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানির কর্মীদের বিমা বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রয়ের পরিমাণ বা পুরস্কারনির্ভর আর্থিক ও অ-আর্থিক প্রণোদনাও বন্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। গ্রাহকের নিজস্ব ব্যাংক হিসাব থেকে সরাসরি বিমা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রিমিয়াম পাঠানোর ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ রাখা হবে না; তবে Bima-ASBA ব্যবস্থাকে এর ব্যতিক্রম হিসেবে রাখা হয়েছে।
গ্রাহকের অনলাইন অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বিভ্রান্তিকর ডিজিটাল কৌশল বা ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ ব্যবহারে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি কোনো পণ্য সম্পর্কে তথ্য দেখার আগে গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য নেওয়া যাবে না বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পণ্যের বৈশিষ্ট্য, মূল্য নির্ধারণ এবং দাবি পরিশোধের কর্মদক্ষতা সহজে জানার সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
বিমা প্রতিষ্ঠান এবং বড় বিতরণকারী সংস্থাগুলোকে নিজেদের কমিশন নীতি প্রকাশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৫০ কোটি রুপির বেশি কভারযুক্ত পলিসিতে কমিশনের তথ্য প্রকাশের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।
বুধবার রাতে প্রকাশিত পরামর্শপত্রে জীবন, স্বাস্থ্য ও মোটরবিমা—তিন ক্ষেত্রেই কমিশনের সর্বোচ্চ সীমা পুনরায় চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে এগুলো এখনও প্রস্তাবিত পরিবর্তন; চূড়ান্ত নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ও পরামর্শ বিবেচনা করা হবে।









