রাজধানীর পল্টনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত প্রতিনিধিসভায় হঠাৎ পুলিশি অভিযানের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সারাদেশ থেকে আসা দলীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে যখন সভা চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে কার্যালয়টি ঘিরে ফেলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রিজন ভ্যানে করে প্রায় চারশ নেতা-কর্মীকে হাতকড়া পরিয়ে পল্টন থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সভা পরিচালনার অধিকার নিয়ে এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
জাসদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার এবং পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে যথাযথভাবে লিখিতভাবে অবহিত করেই এই কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিসভার আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন ও বিপক্ষ দলের কার্যক্রমে সেই পূর্বনির্ধারিত সভা পণ্ড হয়ে যায়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে। জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনের অভিযোগ অনুযায়ী, সভা চলাকালীন হঠাৎ সেখানে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের একদল নেতা-কর্মী প্রবেশ করে হট্টগোল শুরু করে। এর ঠিক পরপরই বিকেল তিনটার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার বদলে জাসদের নেতা-কর্মীদেরই আটক করতে শুরু করে।
অন্যদিকে পুলিশের ভাষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ সাংবাদিকদের জানান, জাসদ কার্যালয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত দল ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা একত্রিত হয়ে গোপন বৈঠক বা নাশকতার পরিকল্পনা করছে—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রতিনিধি সভাস্থল থেকে নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার তথ্যও তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। আটককৃতদের পল্টন থানায় নিয়ে পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং যাদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততা মিলবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আটক ব্যক্তিদের তালিকায় কেবল রাজনৈতিক কর্মীরাই নন, বরং পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে আসা গণমাধ্যমকর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু জাফর সূর্য নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাতকড়া পরা একটি ছবি পোস্ট করে জানান যে, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তাঁকেও আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জাসদের পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতির অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক একটি রাজনৈতিক সভা ছিল। পুলিশ এবং একটি রাজনৈতিক দলের যৌথ আচরণে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে জাসদের সভা করার মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
একটি অনুমোদিত রাজনৈতিক দলের সাধারণ সভা চলাকালে এই ধরনের অভিযান এবং শত শত মানুষকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত না হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।








