দেশের সেবাখাতে দুর্নীতির বিস্তার ও মাত্রা ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সংস্থাটির সর্বশেষ জাতীয় খানা জরিপে দেখা যায়, বর্তমানে সেবা গ্রহণকারী মানুষের মধ্যে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। দুই বছর আগে এই হার ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়। জরিপে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবাখাতে ঘুষ, অনিয়ম, হয়রানি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিস্তৃত চিত্র উঠে আসে।
জরিপে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং সেবা পাওয়ার জন্য এক ধরনের বাধ্যতামূলক শর্তে পরিণত হয়েছে। সেবা নিতে আসা বহু মানুষ জানিয়েছেন, ঘুষ না দিলে নির্ধারিত সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি ঘুষ প্রদানকে এক ধরনের নিয়মিত সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেবাখাতে দুর্নীতির কারণে মোট ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ১ দশমিক ৫৮ শতাংশের সমান। এই বিপুল অর্থের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দরিদ্র, প্রান্তিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর। তারা সেবা পেতে গিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হয়রানি ও আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন।
জরিপে আরও দেখা যায়, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষরা বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। নারীরা এবং ক্ষমতাহীন গোষ্ঠী সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন, যেখানে প্রভাবশালীরা সহজে সুবিধা আদায় করতে পারছেন।
দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার চিত্রও জরিপে উঠে এসেছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মাত্র ২৬ শতাংশ সংশ্লিষ্ট সংস্থা সম্পর্কে জানেন, আর অভিযোগ করার হার মাত্র ০ দশমিক ৯ শতাংশ। এটি জনগণের আস্থাহীনতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্নীতি দমন কার্যক্রমে স্থবিরতা এবং দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণ নেতৃত্বের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়, সেবাখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করতে হবে এবং দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায় কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে কঠোর ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মন্তব্য