জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুলাই ২০২৬, ৩:১১ পিএম

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও কুপিয়ে হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। কিশোরটির মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর হামলায় ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। পরে তাঁর বাড়িঘর ও নিয়ন্ত্রণে থাকা বলে অভিযোগ করা কয়েকটি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। একই ঘটনায় একদিকে কিশোর হত্যার বিচার দাবি উঠেছে, অন্যদিকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) রাতে সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাটেরখীল গ্রামে এসব ঘটনা ঘটে। নিহত কিশোর নাঈম স্থানীয় একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। হামলায় নিহত নুরুল ইসলাম ইরান (৪৫) ওই এলাকার নুরুল হকের ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহত কিশোরের স্বজনদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। সম্প্রতি তাঁর এক সহযোগীর কিছু ইয়াবা হারিয়ে যাওয়ার পর সেই ইয়াবা নাঈম ও ২০ বছর বয়সী এমরানের কাছে রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এই অভিযোগের জের ধরে গত সোমবার (২০ জুলাই) রাতে ইরান কয়েকজন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে নাঈম ও এমরানকে তাঁদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাঁদের নিয়ে যাওয়ার পর দুজনের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে নাঈমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয় এবং তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে বাড়ির সামনে ফেলে রেখে যাওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে এমরানকেও মারধর করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ করেন তাঁর স্বজনেরা।
এমরানের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তাঁরা ইরানের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলে তাঁর পক্ষ থেকে টাকা দাবি করা হয়। পরে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার পর এমরানকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে তাঁরা জানান। এরপর নাঈম ও এমরান দুজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে নাঈমের মৃত্যু হয়। এমরান বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
নাঈমের চাচা মো. ফারুক বলেন, তাঁর ভাতিজা অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও স্বভাব-চরিত্রে ভালো ছিল। হারিয়ে যাওয়া ইয়াবার দায় তাঁর ভাতিজা ও এমরানের ওপর চাপিয়ে তাঁদের তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। গুরুতর আহত নাঈমকে বাড়ির সামনে ফেলে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
নাঈমের মৃত্যুর পর শনিবার বিকেলে তাঁর জানাজাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিকেল ৫টার দিকে জানাজার সময় মাইক থেকে নাঈমের ওপর চালানো নির্যাতনের প্রতিবাদ জানানো হয়। এর কিছুক্ষণ পর ইরান কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
পরে মাইকিং করে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষকে জড়ো করা হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। একপর্যায়ে চার গ্রামের লোকজন ইরানকে খুঁজে বের করে তাঁর ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলায় তিনি নিহত হন। এরপর উত্তেজিত লোকজন তাঁর বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাশাপাশি ইরানের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে অভিযোগ ওঠা ১০ থেকে ১২টি ঘর ভাঙচুর করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, নাঈমের মৃত্যুর ঘটনায় শনিবার থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, নাঈমের জানাজা শেষে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ইরানকে হত্যা করে এবং তাঁর বাড়িতে আগুন দেয়। একই সঙ্গে ইরানের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো—এমন ১০ থেকে ১২টি ঘর ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
ঘটনাটি ঘিরে এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। নাঈম ও এমরানের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা কী, তাঁদের ওপর হামলায় কারা জড়িত ছিলেন এবং নাঈমের মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে ইরানকে হত্যার ঘটনায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে জড়িত ছিল, সেটিও আইনি প্রক্রিয়ায় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের একাংশ নাঈম হত্যার সুষ্ঠু বিচার ও অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। নিহত কিশোরের স্বজনদেরও দাবি, তাঁর ওপর চালানো নির্যাতনের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিশোধের নামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাতেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। নাঈম হত্যার মামলার তদন্তের পাশাপাশি ইরান হত্যার ঘটনা এবং পরবর্তী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ না হলে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সব পক্ষের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য