একটি শিশু প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিকভাবে বাড়ি থেকে বের হলো। কেউ হয়তো মাদ্রাসায় বা স্কুলে যাওয়ার জন্য, কেউ বা বাড়ির আঙিনায় বন্ধুদের সাথে খেলতে। আবার কেউ হয়তো পরিবারের সদস্যের হাত ধরেই বের হয়ে হুট করে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হলেও সে আর বাড়ি ফিরল না। দিশেহারা পরিবার ছুটে গেল নিকটস্থ থানায়, লিখিত ডায়েরি (জিডি) হলো। এর পর থেকেই শুরু হলো এক অসীম ও যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষা—সন্তান কি আদৌ আর ফিরে আসবে?
সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান সেই পারিবারিক অপেক্ষাকে একটি ভয়াবহ জাতীয় সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় ১৬ হাজার শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্যে সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত নথিতে এই সংখ্যা বলা হয়েছে ১৫ হাজার ৯১৭। অন্যদিকে, ১ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সরকারের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, একই সময়ে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ৭১৭টি।
দুই সরকারি হিসেবের মধ্যে প্রায় ২০০টির পার্থক্য থাকলেও মূল সংকটের চিত্রে কোনো তফাৎ নেই। হিসেব করলে দেখা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৭৫টির বেশি শিশু নিখোঁজের অভিযোগ পুলিশের খাতায় নথিভুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ২০ মিনিটে একজন করে শিশু নিখোঁজ হচ্ছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শিশু নিখোঁজের এমন রেকর্ডভাঙা ভয়াবহ রূপ আগে কখনো দেখা যায়নি। তবে এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে ভীতিকর দিকটি কেবল নিখোঁজের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই হাজার হাজার শিশুর মধ্যে কতজন পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, কতজনকে পুলিশ উদ্ধার করেছে এবং কতজন এখনো হারিয়ে আছে—তার কোনো পূর্ণাঙ্গ কিংবা হালনাগাদ তথ্য সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নেই।
মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হওয়া তানভীর আর ফেরেনি
মিরপুরের রূপনগর থানা এলাকার ১০ বছরের শিশু মোহাম্মদ তানভীর আহমেদ প্রতিদিনের মতোই বাড়ি থেকে বের হয়েছিল মাদ্রাসার উদ্দেশে। কিন্তু সে আর বাড়ি ফেরেনি। সন্তানের কোনো হদিস না পেয়ে শেষমেশ রূপনগর থানায় জিডি করেন তার বাবা আবদুর রহিম। ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে, কিংবা তাকে কোনো চক্র অপহরণ করেছে কিনা—এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন এই অসহায় পিতা।
একই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি ৯ বছরের শিশু আলি হোসেনের পরিবারও। গত ৯ মে বিকেলে ঢাকার দারুস সালাম এলাকায় সমবয়সীদের সাথে খেলতে বের হয়ে আর ফেরেনি আলি। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরদিন দারুস সালাম থানায় জিডি করেন তার বাবা।
তানভীরের গন্তব্য ছিল মাদ্রাসা আর আলি বের হয়েছিল খেলতে। প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও দুটি পরিবারের গন্তব্য এখন একই—নিখোঁজ সন্তানকে ফেরতের আকুতি আর রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দরজায় কড়া নাড়া।
কোন মাসে কত শিশু নিখোঁজ?
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাসভিত্তিক নিখোঁজের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তা হলো:
- জানুয়ারি: ১,৭৬৮ জন
- ফেব্রুয়ারি: ১,৩৯২ জন
- মার্চ: ১,৭০৮ জন
- এপ্রিল: ২,৬৬০ জন
- মে: ২৫৬ জন
- জুন: ৩,১৬৩ জন
- জুলাই: ৩১১ জন
এর মধ্যে জুন মাসে শিশু নিখোঁজের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ—৩ হাজার ১৬৩ জন।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই মাসভিত্তিক সংখ্যাগুলো যোগ করলে মোট ১৫,৯১৭ এর হিসাব মেলে না। আবার অন্যদিকে সরকারি ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে মোট জিডি ১৫,৭১৭টি। শিশু নিখোঁজের মতো চরম সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারি নথিপত্রের এই অমিল ও অসঙ্গতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে।
আগের সাত মাসের তুলনায় পরিস্থিতি আরও অবনতিশীল
শিশু নিখোঁজের এই তীব্র সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। সরকারি তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আগের বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছিল ১৩,৮৭৬টি।
তার বিপরীতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই সাত মাসে জিডির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫,৭১৭টিতে। অর্থাৎ, তুলনামূলকভাবে মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে শিশু নিখোঁজের জিডি বেড়েছে ১,৮৪১টি, যা শতকরা হিসেবে প্রায় ১৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ নিখোঁজের হার কমার বদলে ক্রমাগত বাড়ছে।
১৫ হাজার শিশু কি সত্যিই এখনো নিখোঁজ?
পরিসংখ্যানের এই জায়গায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ধোঁয়াশা। সরকার ১৫,৭১৭টি জিডির কথা নিশ্চিত করলেও তার অর্থ এই নয় যে এরা সবাই এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান উল্লেখ করেছেন, জিডি করার পর অনেক শিশুই পরবর্তীতে নিজেদের চেষ্টা বা পরিবারের উদ্যোগে ঘরে ফিরে আসে। কিন্তু তাদের মধ্যে ঠিক কতজন সুস্থদেহে ফিরে এসেছে, কতজনকে পুলিশ উদ্ধার করতে পেরেছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ বা অপরাধীদের হাতে বন্দি—সেই নির্দিষ্ট তথ্য ডেটাবেজে অনুপস্থিত।
এখানেই উঠে আসছে রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় গাফিলতি।
- নিখোঁজ শিশু বাড়ি ফিরে এলে সেই তথ্য কি জিডি ফাইলের সাথে আর আপডেট করা হয়?
- উদ্ধার হওয়া শিশুর তথ্য কি জাতীয় ডেটাবেজে যুক্ত হয়?
- এক থানা অন্য থানার নিখোঁজ উদ্ধার হওয়া শিশুর খবর রাখে?
- শিশুটি পাচার নাকি হত্যার শিকার হলো—তার কোনো আলাদা সমন্বিত ডাটাবেজ আছে?
এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। ফলে হাজার হাজার জিডির আড়ালে আসল পরিস্থিতি অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে।
জিডি ফাইল বন্দি, উদ্ধার অভিযানে দীর্ঘসূত্রতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই অনুসন্ধানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ (Golden Hours)। এই সময়ের মধ্যে শিশুটির ছবি, পোশাক, শারীরিক পরিচয় এবং সম্ভাব্য গন্তব্যের তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া গেলে তাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সন্তান হারানোর পর অনেক পরিবারকেই পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘোরার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগে পোস্টার ছাপিয়ে বা মাইকিং করে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। জিডি করার পর পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে কিনা, বাস বা রেল স্টেশনে বার্তা পাঠাচ্ছে কিনা—তা নিয়ে স্বজনদের অনিশ্চয়তায় ভুগতে হয়। আর সময় যতই পার হতে থাকে, নিখোঁজ শিশুটিকে জীবিত বা সুস্থ অবস্থায় উদ্ধারের আশা ততটাই ক্ষীণ হয়ে আসে।
মুসকানকে ২৩ ঘণ্টায় উদ্ধারের দৃষ্টান্ত
সঠিক সময়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে শিশু উদ্ধার সম্ভব—তার উজ্জ্বল প্রমাণ মিরপুরের ঘটনা। পাঁচ বছরের শিশু জারা বারোকা মুসকান ও তার আট বছরের ভাই সাঈদ গত ১৪ জানুয়ারি বিকেলে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশন থেকে নিখোঁজ হয়। অনুসন্ধানে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় এক যুবকের সাথে তারা যাচ্ছে।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুসকানের ছবি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ডিজিটাল বিলবোর্ডে ছবি প্রদর্শন এবং পুলিশের তৎপরতায় দ্রুত সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো হয়। এর ফলে মাত্র ২৩ ঘণ্টার মাথায় সদরঘাটের একটি লঞ্চ থেকে মুসকানকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
প্রশ্ন হলো—মুসকানের ক্ষেত্রে যেভাবে পুরো ব্যবস্থা একযোগে কাজ করেছে, দেশের প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে কেন সেই তাৎক্ষণিক তৎপরতা দেখা যায় না?
মুন অ্যালার্ট চালু হলেও কার্যকারিতা নিয়ে ধোঁয়াশা
নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুততর করতে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পুলিশের সিআইডি ও ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর যৌথ উদ্যোগে চালু করা হয় ‘মুন অ্যালার্ট’। দ্রুততম সময়ে ছবি ছড়ানো ও জনগণকে অনুসন্ধানে সম্পৃক্ত করতে ‘১৩২১৯’ নম্বর হেল্পলাইন চালু করা হয়।
তবে উদ্যোগ চমৎকার হলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চালু হওয়ার কয়েক মাস পরেও সিআইডির তরফে জানানো হয়েছিল, কারিগরি ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতির অভাবে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোদমে এর প্রয়োগ শুরু করতে পারেনি। ফলে সংকটের মুহূর্তেও বিশেষায়িত একটি সেবা চালুর পর থমকে থাকে।
সীমান্তের ওপারে পাচারের আতঙ্কে জেলাগুলো
শিশু নিখোঁজ হওয়ার এই ভয়াবহ চিত্র কেবল রাজধানী ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম, পাবনা, সাতক্ষীরা এবং ঝিনাইদহের মতো জেলাগুলো থেকেও নিয়মিত শিশু গায়েব হওয়ার খবর মিলছে।
বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহের মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র। সীমান্ত পেরিয়ে শিশুদের পাচার করে দেওয়ার আতঙ্কে তটস্থ স্থানীয় বাসিন্দারা।
নিখোঁজ হওয়া সব শিশুই পাচারের শিকার—এমনটা না হলেও, বিষয়টিকে নিছক ‘হারিয়ে গেছে’ বলে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একবার নিখোঁজ হওয়ার পর একটি শিশু সুসংগঠিত অপরাধী চক্রের মাধ্যমে অপহরণ, মানব পাচার, বলপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি, শিশুশ্রম, বিকৃত যৌন নিপীড়ন কিংবা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারে।
পাচার, ভিক্ষাবৃত্তি থেকে শুরু করে অঙ্গহানি
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, নিখোঁজ বা অপহৃত শিশুদের মূলত কয়েকটি কাজে ব্যবহার করে অপরাধী চক্রগুলো:
১. জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি ও অঙ্গহানি: শিশুদের হাত-পা ভেঙে বা শারীরিক অঙ্গহানি ঘটিয়ে রাস্তায় ভিক্ষা করতে বাধ্য করা হয়।
২. নবজাতক চুরি ও বিক্রি: সন্তানহীন দম্পতিদের কাছে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে হাসপাতাল বা বাসা থেকে শিশু চুরি করা হয়।
৩. মুক্তিপণ ও পূর্বশত্রুতা: বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে কিংবা পারিবারিকভাবে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে জিম্মি করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তৌহিদুল হকের মতে, শিশু নিখোঁজ ও পাচারের পেছনে দেশে মাদকের অবাধ বিস্তার এবং বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। অপরাধীরা জানে যে পার পাওয়া সহজ, আর তাই শিশুদের নিশানা বানিয়ে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে।
স্মরণকালের নির্মম ঘটনা ও লাশের সারি
নিখোঁজ হওয়ার খবরটি যে কত বড় ট্র্যাজেডিতে রূপ নিতে পারে, তার জলন্ত উদাহরণ সিলেটের শিশু মুনতাহা আক্তার জারিন। ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর নিজ এলাকা কানাইঘাট থেকে নিখোঁজ হওয়া পাঁচ বছরের মুনতাহার বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয় নিখোঁজের ৭ দিন পর। নিখোঁজের জিডিটি পরবর্তীতে পরিণত হয় নির্মম হত্যা মামলায়।
এমন ঘটনা চলতি বছরেও অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রামের পটিয়ায় পাঁচ বছরের শিশু মো. জায়হান নিখোঁজের পর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তার বস্তাবন্দী নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। একইভাবে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় ছয় বছরের শিশু জিহাদ নিখোঁজের কয়েক দিন পর মিলল পুকুরে ভাসমান লাশ।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত পরিচয় লাশগুলোর তথ্যের সাথে নিখোঁজ হওয়া শিশুদের জিডির তালিকা মিলিয়ে দেখার মতো কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা পুলিশ কি আদৌ গড়ে তুলতে পেরেছে?
বহু বছরের পুরনো ডাটাবেজ সমস্যা
তথ্য ব্যবস্থাপনার এই ঘাটতি আজ নতুন নয়। ২০২২ সালেও কেবল রাজধানী ঢাকাতেই নিখোঁজ সংক্রান্ত ৫,৯৮৪টি জিডি নথিভুক্ত হয়েছিল। তখনও পুলিশের জবাব একই ছিল—জিডি করার পর কতজন শিশু ফিরে এসেছে তার নিখুঁত হিসেব পুলিশের কাছে থাকে না, কারণ পরিবারগুলো সন্তান খুঁজে পাওয়ার পর আর থানায় জানানোর তাগিদ অনুভব করে না।
কয়েক বছর পার হলেও তথ্যের এই জটিলতা বা ঘাটতি দূর করতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জিডি জমা হচ্ছে, শিশুরা হারিয়ে যাচ্ছে বা ফেরত আসছে, কিন্তু কোনো কেন্দ্রীয় ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে সেই তথ্য নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে না।
কাগজে উদ্যোগ নয়, জনগণ দেখতে চায় দৃশ্যমান ফলাফল
সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, সিআইডির তদন্ত সেল, মুন অ্যালার্ট, ডিজিটাল বিলবোর্ডে প্রচারসহ নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও দিনশেষে জনগণ দেখতে চায় সুস্পষ্ট ফলাফল।
সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি জিডি সামনে আসার পর সাধারণ মানুষ সরাসরি কয়েকটি উত্তর জানতে চায়:
- এই ১৫ হাজার নিখোঁজ শিশুর মধ্যে মোট কতজন নিরাপদে বাড়ি ফিরেছে?
- কতটি শিশু পাচারকারী ও অপহরণকারী চক্রকে গ্রেপ্তার করে বিচারে সোপর্দ করা গেছে?
- ঠিক কতজন শিশুকে মৃত অবস্থায় বা অজ্ঞাত লাশ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে?
একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া কেবল ওই নির্দিষ্ট পরিবারের একার দুর্ভাগ্য নয়, এটি পুরো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য চরম বার্তা। পুলিশের নিয়মিত উত্তর কিংবা গতানুগতিক ব্রিফিং দিয়ে এই আতঙ্কের অবসান ঘটানো সম্ভব নয়। দেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিটি বাবা-মা চান থানায় গিয়ে জিডি করার পর রাষ্ট্রীয় বাহিনী স্বউদ্যোগে তাদের সন্তানকে উদ্ধার করে দিক, গ্রেপ্তার হোক অপরাধী চক্র।
কারণ একটি পরিবার হয়তো বছরের পর বছর ধরে নিখোঁজ সন্তানের জন্য দুয়ারে পথ চেয়ে বসে থাকতে পারে, কিন্তু একটি কার্যকর রাষ্ট্রের পক্ষে এমন নীরব ও দিশেহারা ভূমিকা পালন করার কোনো সুযোগ নেই।









