২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা ও পুলিশের স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের সময় বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ বেহাত হয়েছিল। এর একটি অংশ পরবর্তী সময়ে উদ্ধার কিংবা জমা পড়লেও এখনো কিছু অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে রয়ে গেছে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব অস্ত্র উদ্ধারে নতুন করে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে গলাকাটা মোবারকের কাছ থেকে এমনই একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। পুলিশের অভিযান চলাকালে মোবারক যে পিস্তল দিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েছিল, সেটি পুলিশেরই একটি আগ্নেয়াস্ত্র বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা থেকে পিস্তলটি লুট হয়েছিল।
গ্রেপ্তারের পর পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক দাবি করেছে, সে অন্য এক সন্ত্রাসীর মাধ্যমে ওই অস্ত্র পেয়েছিল। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সন্দেহ, ৫ আগস্ট কোতোয়ালি থানায় হামলা ও লুটপাটের সময় মোবারক নিজেও অস্ত্র লুটের ঘটনায় জড়িত ছিল। তার কাছে কীভাবে অস্ত্রটি পৌঁছাল এবং এর আগে সেটি কার দখলে ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ওই দিনের সহিংস পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় থানা ও পুলিশ স্থাপনায় হামলার সুযোগে অপরাধী চক্রের সদস্যরা অস্ত্র লুটে নেয়। একই সময়ে সাধারণ মানুষের একটি অংশও বিভিন্ন কারণে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে সরকারের আহ্বান এবং পুরস্কার ঘোষণার পর অনেকে সেগুলো জমা দেন। কোথাও কোথাও পরিত্যক্ত অবস্থায়ও অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, লুট হওয়া অস্ত্রের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে যেসব অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি, সেগুলোর একটি অংশ অপরাধীদের হাতে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এসব অস্ত্র অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে নতুন উদ্যোগ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে নতুন করে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে বিশেষ ইউনিটও অস্ত্র উদ্ধারের কাজ করছে।
অস্ত্র উদ্ধারে তথ্য দেওয়ার বিষয়েও পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে, অপরাধীদের হাতে থাকা অস্ত্র শনাক্ত ও উদ্ধার করতে গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এক দিনে লুট হয়েছিল হাজার হাজার অস্ত্র
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন পুলিশের ৪৬০টি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১১৪টি থানায় ভাঙচুর এবং ৫৬টি থানায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। একই সময়ে পুলিশের বিভিন্ন ধরনের ১ হাজার ২৪টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এসব হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫২ হাজার গোলাবারুদ লুণ্ঠিত হয়। লুট হওয়া অস্ত্রের তালিকায় ২০২৪ সালের এপ্রিলে বান্দরবানে ব্যাংকে হামলার ঘটনায় পুলিশ ও আনসার বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে।
ঘটনাগুলোর পর বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হলেও সব অস্ত্রের হদিস পাওয়া যায়নি। ফলে উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলো কোথায় রয়েছে, কারা সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সেগুলো কোনো অপরাধে ব্যবহার হয়েছে কি না—এসব বিষয় এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
গলাকাটা মোবারকের কাছ থেকে পুলিশের লুট হওয়া পিস্তল উদ্ধারের ঘটনা সেই উদ্বেগকেই নতুন করে সামনে এনেছে। একটি লুট হওয়া অস্ত্র কীভাবে একাধিক ব্যক্তির হাত ঘুরে একজন সন্ত্রাসীর কাছে পৌঁছাতে পারে, তারও অনুসন্ধান চলছে। একই সঙ্গে ৫ আগস্টের ঘটনায় লুট হওয়া অবশিষ্ট অস্ত্র ও গোলাবারুদ দ্রুত শনাক্ত করে উদ্ধারের ওপর জোর দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।









