দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরায় দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ২৩৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ দুই দিনেই নতুন করে ২৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলা সদর হাসপাতালসহ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বাড়তি সতর্কতা জারি করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাতক্ষীরায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩৯ জনে। এর মধ্যে ৬ সেপ্টেম্বর ১৫ জন এবং ৭ সেপ্টেম্বর আরও ১৩ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। অর্থাৎ মাত্র দুই দিনে ২৮ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৩২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২০৭ জন। আক্রান্তদের মধ্যে সাতজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলার বাইরে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে গিয়ে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নেওয়া বিশেষ ব্যবস্থার চিত্র দেখা যায়। হাসপাতালের নিচতলার ২ নম্বর ওয়ার্ড পুরুষ রোগীদের এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ড নারী রোগীদের জন্য পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি মশার সংস্পর্শ থেকে তাদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কর্তব্যরত নার্স আরিফা খাতুন জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। রোগীদের পাশাপাশি হাসপাতালে থাকা অন্য ব্যক্তিদেরও মশাবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে প্রতিটি শয্যায় মশারির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. জয়ন্ত কুমার সরকার বলেন, জেলা সদর হাসপাতাল এবং বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিনই নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন। জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ব্যথা কিংবা ডেঙ্গুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করলেই হবে না। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাও সমান জরুরি। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, উঠান কিংবা আশপাশে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই নিয়মিতভাবে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা এবং পানি জমতে পারে এমন পাত্র পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন।
ডা. জয়ন্ত কুমার সরকারের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বাসাবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে ধ্বংস করা না গেলে আক্রান্তের সংখ্যা কমানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সাতক্ষীরায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের পক্ষ থেকে অবশ্য শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক প্রস্তুতির ওপর নির্ভর না করে নগর ও গ্রামাঞ্চলে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারের দাবি উঠেছে। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে এডিস মশার বিস্তার কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
এ অবস্থায় ডেঙ্গুর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে সতর্কতা বাড়ানোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা। নতুন রোগী শনাক্তের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে—তাই আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।









