রাজধানীর খুচরা বাজারে আবারও বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এক ও দুই লিটারের বোতল অনেক দোকানে নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচ লিটারের বোতলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন বিক্রেতারা। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের বাজারেও।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে লিটারপ্রতি ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায় উঠেছে। একই সময়ে খোলা পাম তেলের দাম প্রায় শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা দুই ধরনের ভোজ্যতেলের দাম লিটারে প্রায় ২ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো আগের তুলনায় কম পরিমাণে বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে ছাড়ছে। ফলে ডিলার ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও তাঁরা প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেল পাচ্ছেন না। কয়েকজন ডিলারের বরাত দিয়ে বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং সে কারণে বাজারে সরবরাহ কমানো হয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা যায়, চাহিদা অনুযায়ী বোতলজাত সয়াবিন তেলের মজুত নেই। অন্তত ছয়টি দোকানে মাত্র চার-পাঁচটি করে বোতল পাওয়া গেছে। কোনো দোকানে এক লিটারের বোতল নেই, আবার কোথাও দুই লিটারের বোতল পাওয়া যায়নি। পাঁচ লিটারের বোতলের ক্ষেত্রেও সরবরাহ সীমিত বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে বাজারে বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিক্রেতাদের ভাষ্য, যতটুকু তেল আসছে, তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আবার সরবরাহ করা তেলের একটি অংশ অনেক দোকানি প্রকাশ্যে না রেখে সংরক্ষণ করছেন। নিয়মিত ক্রেতাদের প্রয়োজন মেটাতে তাঁরা এভাবে সীমিত মজুত ধরে রাখছেন।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মুদি বিক্রেতা ইমান আলী বলেন, তাঁর দোকানে প্রতিদিন প্রায় ১০ কার্টন সয়াবিন তেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিলারের কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন মাত্র চার কার্টন। ফলে নিয়মিত ক্রেতারা তেল চাইলে দেওয়ার জন্য কিছু বোতল আলাদা করে রাখতে হচ্ছে।
চলতি বছরে তৃতীয় দফা সরবরাহ সংকট
চলতি বছরে এর আগেও কয়েক দফা বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে টান পড়েছিল। বছরের শুরুতে, ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে প্রথম দফায় সংকটের খবর পাওয়া যায়। এরপর এপ্রিলের শেষ দিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
জুলাইয়ের দিকে আবারও বাজারে সরবরাহ কমে যায়। পরে ৩ সেপ্টেম্বর লিটারে আরও ৫ টাকা বাড়িয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এখন আবার সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ায় বাজারে নতুন করে দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ চলতি বছরেই অন্তত তিন দফা বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেই ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড ভেজিটেবল ফ্যাট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। এ বিষয়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যসচিবের কাছে সংগঠনটি চিঠি দেয়।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে সরকার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। বুধবার সিলেটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ব্যবসায়ীরা ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর দাবি জানালেও সরকার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে। যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হবে না বলেও তিনি জানান।
বোতলজাত তেলের সংকটে বাড়ছে খোলা তেলের চাপ
বাংলাদেশের বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেলে অনেক ক্রেতাই বিকল্প হিসেবে খোলা সয়াবিন তেল কিনতে বাধ্য হন। এতে খোলা তেলের চাহিদা বেড়ে যায় এবং সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বাড়ার পেছনে বাজারের এই পরিবর্তিত চাহিদার প্রভাবও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ভোজ্যতেল সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি। রান্নার তেলের দাম বাড়লে শুধু তেল কেনার খরচই বাড়ে না, সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর পুরো খাদ্য বাজেটেও চাপ পড়ে। বিশেষ করে যেসব পরিবার নিয়মিত মাছ-মাংসের পরিবর্তে ডিম বা মুরগির ওপর নির্ভর করে, তাদের জন্য একই সময়ে একাধিক খাদ্যপণ্যের দাম বাড়া বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করে।
এক সপ্তাহে ডিমের দাম বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা
সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকটের মধ্যেই গত এক সপ্তাহে ফার্মের মুরগির ডিমের দামও বেড়েছে। এক ডজন ডিমের দাম প্রায় ১০ টাকা বেড়ে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় উঠেছে। পাড়া-মহল্লার মুদিদোকানে এক হালি ডিম কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকা।
স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি। অনেক পরিবার একসঙ্গে এক ডজন ডিম না কিনে প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা দুইটি করে ডিম কেনে। সে হিসাবে খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম প্রায় ১৫ টাকা পড়ছে।
এদিকে ব্রয়লার মুরগির দামও বেশ কিছুদিন ধরে কমেনি। প্রায় দুই মাস ধরে বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। ফলে ডিমের দাম নতুন করে বাড়ায় সাধারণ ভোক্তাদের জন্য তুলনামূলক সস্তা প্রাণিজ আমিষের উৎসগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই
মাছের বাজারেও দীর্ঘদিন ধরে দাম বাড়তি। রাজধানীর বাজারগুলোতে দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের রুই মাছ প্রতি কেজি ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
অর্থাৎ একই সময়ে রান্নার তেল, ডিম, মুরগি ও মাছ—প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একাধিক পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি রয়েছে। এর ফলে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনার চাপ তৈরি হচ্ছে।
রাজধানীর শেখেরটেক এলাকার নিরাপত্তারক্ষী আনসার হোসেন বলেন, তাঁর আয় সীমিত হওয়ায় ব্রয়লার মুরগি ও ডিমই তুলনামূলকভাবে সামর্থ্যের মধ্যে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্রয়লার মুরগির দাম দুই-তিন মাসেও কমেনি। এর মধ্যে ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১৬০ টাকা হওয়ায় তাঁর মতো মানুষের জন্য বাজার সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের নজর এখন মূলত বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ ও দাম—দুই দিকেই। কোম্পানিগুলোর মূল্যবৃদ্ধির দাবি সরকার কীভাবে যাচাই করে এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই সামনে ভোজ্যতেলের বাজারের পরিস্থিতি অনেকটা নির্ভর করবে।









