সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মদিনায় একটি বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্রে ড্রোন হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং একাধিক আরব দেশ। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) পৃথক বিবৃতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইন হামলার নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, ইয়েমেনভিত্তিক হুতি গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে। তবে হুতিরা অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মদিনার তাইবা বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্রে হামলাটি চালানো হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা থেকে মসজিদে নববীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। হামলায় একটি ট্রান্সফরমার অচল হয়ে গেলেও পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলেছে, হামলার পর পরিচালিত তদন্ত এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে হুতিদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, গত মঙ্গলবার ভোরে হামলাটি হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের ফলাফল, অভিযানের তথ্য ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে হুতিদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।
তবে হুতিদের পরিচালিত সংবাদ সংস্থা সাবার এক প্রতিবেদনে গোষ্ঠীটির এক সামরিক কর্মকর্তা সৌদি জোটের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি দাবিটিকে ‘মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর ভাষ্য, মক্কায় হুতিদের হামলার অভিযোগের পক্ষে সৌদি আরব প্রমাণ দিতে না পারায় সেই বিষয় থেকে দৃষ্টি সরাতেই মদিনার হামলার অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, মদিনার বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববীকে ঘিরে ধারাবাহিক হামলার প্রচেষ্টার অংশ। জোটের ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হতে পারে। পবিত্র স্থান ও মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে তারা।
মদিনার ঘটনার পর ওআইসি এক বিবৃতিতে ‘তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ’ জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, মদিনার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও স্থাপনায় হামলা বিপজ্জনক উত্তেজনা বাড়ায় এবং পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদার লঙ্ঘন ঘটায়। একই সঙ্গে ওআইসি ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক ও মানবিক আইন এবং প্রচলিত নীতিমালার পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সৌদি আরবের ভূখণ্ড, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেশটির নেওয়া পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়েছে ওআইসি। ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা এবং সৌদি নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় নেওয়া উদ্যোগের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে সংস্থাটি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মদিনার হামলাকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ এবং দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে। আবুধাবি সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
জর্ডানও হামলার নিন্দা জানিয়ে এটিকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। দেশটির মতে, এই ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকি। জর্ডান হামলাটিকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ফুয়াদ মাজালি সৌদি আরবের প্রতি জর্ডানের পূর্ণ সংহতি এবং দেশটির প্রতিষ্ঠান, নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপের প্রতি সমর্থনের কথা জানান।
কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মসজিদে নববীতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী স্থাপনায় হামলা বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ধারাবাহিক বৈরী হামলার অংশ। কুয়েতের ভাষ্য, এ ধরনের হামলা সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন। একই সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ড বিশ্বের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এবং ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদাকে হুমকির মুখে ফেলে।
সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছে কুয়েত। দেশটির মতে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা কুয়েত এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) অন্যান্য সদস্য দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
বাহরাইনও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের ‘অব্যাহত হামলার’ নিন্দা জানিয়েছে। মানামা বলেছে, নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় আত্মরক্ষার অধিকার অনুযায়ী সৌদি আরব যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার প্রতি তারা সমর্থন জানায়।
হুতিদের ধারাবাহিক হামলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাহরাইন। দেশটি ২০১৫ সালের ২২১৬ নম্বর এবং ২০২৬ সালের ২৮১৭ নম্বর প্রস্তাবসহ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানিয়েছে।
মদিনার হামলার আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, মক্কার দক্ষিণে একটি হুতি ড্রোন শনাক্ত করে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটি ধ্বংস করেছে। জোটের দাবি ছিল, ড্রোনটি মক্কার নির্ধারিত নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ভূপাতিত করা হয়।
মদিনার সর্বশেষ হামলা নিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও হুতিদের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। সৌদি পক্ষ তদন্ত ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষার ভিত্তিতে হুতিদের দায়ী করেছে। অন্যদিকে হুতিরা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্যেই ওআইসি ও চারটি আরব দেশের নিন্দা ঘটনাটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষার আলোচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।









