আধুনিক বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের রূপকার জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী

বাংলাদেশের প্রকৌশল জগৎ, শিক্ষা এবং ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। স্বাধীনতার পর থেকে এদেশের প্রায় প্রতিটি মেগা প্রকল্পের কারিগরি নেতৃত্ব ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শের সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। প্রখ্যাত এই প্রকৌশলী, গবেষক ও শিক্ষাবিদকে আধুনিক বাংলাদেশের ভৌত কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জন্ম ও শিক্ষা জীবন

জামিলুর রেজা চৌধুরী ১৯৪৩ সালের ১৫ নভেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কাটে ঢাকায়। তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল এবং ঢাকা কলেজে অধ্যয়ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট) ভর্তি হন এবং ১৯৬৩ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

স্নাতক শেষ করার অব্যবহিত পরেই ১৯৬৩ সালের নভেম্বরে তিনি বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার্থে তিনি যুক্তরাজ্যে গমন করেন এবং সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি (ইঞ্জিনিয়ারিং) ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল সুউচ্চ ভবনের কাঠামো বিশ্লেষণ, যা পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হয়।

কর্মজীবন ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব

শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি প্রশাসনিক এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বুয়েটের অধ্যাপক থাকাকালীন অসংখ্য প্রকৌশলী তৈরি করেছেন যারা বর্তমানে দেশ-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। বুয়েট থেকে অবসরের পর তিনি বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতেও অবদান রাখেন। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দেশের প্রয়োজনে তিনি ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন।

ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে অবদান

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান বা সদস্য হিসেবে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধু সেতু (যমুনা সেতু) নির্মাণের কারিগরি কার্যাবলি থেকে শুরু করে পদ্মা বহুমুখী সেতুর বিশেষজ্ঞ দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। এছাড়াও কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পের কারিগরি পরামর্শক হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

নিচে জামিলুর রেজা চৌধুরীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ও সংশ্লিষ্ট তথ্যসমূহ সংক্ষিপ্তাকারে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়বিবরণ
পুরো নামজামিলুর রেজা চৌধুরী
জন্ম১৫ নভেম্বর ১৯৪৩, সিলেট
মৃত্যু২৮ এপ্রিল ২০২০, ঢাকা
পেশাসিভিল ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষাবিদ ও গবেষক
উচ্চশিক্ষাসাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য (এমএসসি ও পিএইচডি)
বিশেষজ্ঞ ভূমিকাবঙ্গবন্ধু সেতু, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প
পাবলিক সার্ভিসউপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার (১৯৯৬)
প্রকাশনাদেশি-বিদেশি জার্নালে ৬৯টি গবেষণা প্রবন্ধ
জাতীয় সম্মাননাএকুশে পদক (২০১৭), জাতীয় অধ্যাপক (২০১৮)

প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততা

প্রকৌশল বিদ্যায় তাঁর পাণ্ডিত্য থাকলেও তিনি সামাজিক ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনে ছিলেন অত্যন্ত নিবেদিত। তিনি বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি হিসেবে দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে গণিত ও বিজ্ঞানের প্রসার ঘটিয়েছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। পরিবেশ রক্ষায় তাঁর আপসহীন অবস্থানের কারণে তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাঁর মেধার কদর ছিল অনন্য। বিশ্বখ্যাত স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর রহমান খান (এফ আর খান) তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার আহ্বান জানালেও দেশপ্রেমের টানে তিনি বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর গবেষণাপত্রগুলো সুউচ্চ ভবনের নকশা প্রণয়নে আজও বিশ্বজুড়ে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং’ ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১৭ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘একুশে পদক’ প্রদান করে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৯ জুন সরকার তাঁকে ‘জাতীয় অধ্যাপক’ হিসেবে অলঙ্কৃত করে।

২০২০ সালের ২৮ এপ্রিল এই প্রথিতযশা প্রকৌশলী এবং আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের প্রকৌশল ও শিক্ষা জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলেও তাঁর নির্দেশিত পথে গড়ে ওঠা ভৌত অবকাঠামোসমূহ দেশের উন্নয়ন যাত্রায় তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।