আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নির্বিঘ্ন ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে ‘সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটস’ নামক একটি সংগঠন। আজ রোববার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি উত্থাপন করা হয়। সংগঠনটি মনে করে, নির্বাচনের আগে ও পরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
মাঠপর্যায়ের উদ্বেগজনক চিত্র
সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন চট্টগ্রামের রাউজান ও মিরসরাই এলাকায় সাম্প্রতিক সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে চট্টগ্রামের রাউজানে অন্তত ১২টি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অত্যন্ত বর্বরোচিতভাবে রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া মিরসরাইয়ে সাতটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতার মূল লক্ষ্য হলো সংখ্যালঘুদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করা, যাতে তারা আসন্ন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে যেতে সাহস না পায়।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটসের ৫ দফা দাবি:
| ক্রম | দাবির বিষয়বস্তু | উদ্দেশ্য |
| ১ | বিশেষ প্রশাসনিক সেল গঠন | সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিশেষ তদারকি নিশ্চিত করা। |
| ২ | দ্রুত বিচার ও গ্রেপ্তার | রাউজান ও মিরসরাইসহ সব সহিংসতার তদন্ত করে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা। |
| ৩ | ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন | ক্ষতিগ্রস্তদের প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণ করে আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। |
| ৪ | মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা | সহিংসতার শিকার পরিবারের সদস্যদের মানসিক ট্রমা বা আঘাত দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। |
| ৫ | মানবাধিকার কমিশনের নজরদারি | নবগঠিত মানবাধিকার কমিশনকে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। |
বিশিষ্টজনদের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস সংবাদ সম্মেলনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের কথা থাকলেও বর্তমানে সংখ্যালঘুরা এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি অভিযোগ করেন, সংখ্যালঘুদের কার্যত ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে’ পরিণত করা হয়েছে। তাদের ভোটদান থেকে বিরত রাখতে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দেওয়া হচ্ছে।
আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সতেজ চাকমা এই প্রক্রিয়াকে ‘সংখ্যাশূন্যকরণ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ সুযোগ পেলেই দেশান্তরি হচ্ছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ও নাগরিক মর্যাদা রক্ষা করতে না পারলে তারা আরও ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হবেন।
প্রশাসনের ভূমিকা ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, স্থানীয় প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা ঠেকাতে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা কেবল অন্তর্বর্তী সরকার নয়, বরং দেশের সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানান যাতে নির্বাচনের পর কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসা না ছড়ায়। নির্বাচনমুখী দলগুলোকে তাদের ইশতেহারে সংখ্যালঘু সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার এবং মাঠপর্যায়ে নেতা-কর্মীদের সতর্ক রাখার অনুরোধ জানানো হয়।
পরিশেষে, সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটস স্পষ্ট করে জানায় যে, একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ তৈরি করা। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থার সংকট আরও প্রকট হবে।
