জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

রাষ্ট্র যখন আসামির কাঠগড়ায়—নিরাপদ কারা, অনিরাপদ কারা?

জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস দমনের রাষ্ট্রযন্ত্রই যদি মামলার ভারে ন্যুব্জ হয়, তবে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে কে?

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্র নয়—আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা এবং নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ। রাষ্ট্রের এই মৌলিক স্তম্ভগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে শুধু সরকার নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বাংলাদেশ আজ এমন এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—যেখানে রাষ্ট্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তি, সাবেক আমলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা, রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে হত্যা ও অন্যান্য গুরুতর অভিযোগে মামলা হচ্ছে। এসব মামলার প্রত্যেকটির সত্যতা আদালতের বিচারেই নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—একই সঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক সাবেক রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কতটা অটুট থাকে?

সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার, জেলা ও উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধি, বিচারপতি, প্রধান বিচারপতি, নির্বাচন কমিশনের সাবেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেকের নাম যখন হত্যা বা অন্যান্য ফৌজদারি মামলার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা হিসেবে দেখলে চলবে না।

প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার এবং নিরপরাধ ব্যক্তির দ্রুত অব্যাহতি—এই তিনটি বিষয়ই একই সঙ্গে নিশ্চিত করা জরুরি।

কারণ, একজন অপরাধী শাস্তি না পেলে যেমন আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি একজন নিরপরাধ মানুষকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিচয়ের কারণে কারাগারে রাখা হলেও ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো কি দুর্বল হয়ে পড়ছে?

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—যেসব কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান একসময় জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, অপরাধ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড মোকাবিলার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ এখন গুরুতর মামলার আসামি হিসেবে পরিচিত হচ্ছেন।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, সিনিয়র সচিব, সচিব ও অতিরিক্ত সচিব; সাবেক সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক কর্মকর্তা—আইজিপি, অতিরিক্ত আইজি, ডিআইজি, এসপি, ডিবি, এসবি, সিআইডির সাবেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগের খবর জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করছে।

তাঁরা কেউ অপরাধ করে থাকলে অবশ্যই আইনের আওতায় আসবেন। কিন্তু অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণ এক বিষয় নয়।

তদন্তের আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যেমন ন্যায়বিচারের পরিপন্থী, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদার কারণে প্রকৃত অপরাধীকে ছাড় দেওয়াও সমান বিপজ্জনক।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হওয়া উচিত—
‘অপরাধী যে-ই হোক, বিচার হবে; নিরপরাধ যে-ই হোক, মুক্তি পাবে।’

জঙ্গিবাদ কখনো রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে না

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, জঙ্গিবাদ কোনো একক রাজনৈতিক দলের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি।

২০০১ থেকে ২০০৫ সালের বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান, জেএমবি ও অন্যান্য উগ্রপন্থী সংগঠনের বিস্তার এবং ১৭ আগস্ট ২০০৫-এর দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা আমাদের সেই ভয়াবহ বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। পরবর্তীকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল।

সুতরাং অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—

জঙ্গিদের প্রতি শূন্য সহনশীলতা এবং একই সঙ্গে আইনের যথাযথ প্রয়োগ।

কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উগ্রবাদীদের আশ্রয়, প্রশ্রয় বা রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে, তার পরিণতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।

জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের হাতে বোমা যেমন বিপজ্জনক, তাদের হাতে রাজনৈতিক বৈধতা বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ আরও ভয়ংকর। কারণ তখন তারা শুধু কয়েকজন ব্যক্তিকে নয়, রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানকেই চ্যালেঞ্জ করার সাহস পায়।

নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি একটি রাষ্ট্রের জন্য বড় সতর্কবার্তা

আজ যদি সাধারণ নাগরিক মনে করেন তিনি নিরাপদ নন, ব্যবসায়ী বিনিয়োগে আস্থা হারান, বিদেশিরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, সাংবাদিক স্বাধীনভাবে কাজ করতে ভয় পান কিংবা রাজনৈতিক মত প্রকাশকে কেন্দ্র করে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন—তাহলে বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়।

এটি রাষ্ট্রের ওপর আস্থার সংকট।

আর আস্থার সংকট শুধু পুলিশ দিয়ে দূর করা যায় না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরপেক্ষ প্রশাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, পেশাদার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা।

রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন বদলানো জরুরি

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

সরকারের নীতি, দর্শন, মিশন ও ভিশন যদি নাগরিক নিরাপত্তা, আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং জবাবদিহিতাকে কেন্দ্র করে পুনর্গঠিত হয়, তাহলে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

প্রথমত, প্রকৃত জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সহিংসতা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

তৃতীয়ত, হত্যা ও অন্যান্য গুরুতর মামলার তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রমাণনির্ভর।

চতুর্থত, যাঁদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই, তাঁদের দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে না রেখে আইনগত প্রক্রিয়ায় দ্রুত অব্যাহতি বা জামিনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, পুলিশ, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না করে পেশাদার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।

ষষ্ঠত, জঙ্গিবাদের অর্থের উৎস, অস্ত্রের উৎস, অনলাইন প্রচারণা এবং রাজনৈতিক আশ্রয়—সবকিছুর বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিএনপির জন্যও ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময়

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে তাদের জন্যও অতীতের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

২০০১-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার নিয়ে যে সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই ইতিহাস যেন কোনোভাবেই পুনরাবৃত্তি না হয়। বর্তমান সরকার বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—কোনো উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার না করা এবং তাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ না দেওয়া।

মানুষ এখন স্লোগান নয়, নিরাপত্তা চায়; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চায়; রাজনৈতিক মামলা নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত চায়; আতঙ্ক নয়, স্থিতিশীলতা চায়।

তাই বিএনপির জন্যও জনআস্থা ধরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে—নীতি ও রাজনৈতিক কৌশলে স্বচ্ছতা, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা।

শেষ কথা

রাষ্ট্রে অপরাধী নিরাপদ থাকবে—এটি যেমন মেনে নেওয়া যায় না, তেমনি নিরপরাধ মানুষও যেন রাষ্ট্রের ভয়ে বসবাস না করেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

জঙ্গি-সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে হবে, কিন্তু তার নামে নিরপরাধকে গ্রেপ্তার করা যাবে না।
অপরাধীর বিচার করতে হবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নামে বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না।
রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হবে, কিন্তু রাষ্ট্রের শক্তি নাগরিকের বিরুদ্ধে নয়—নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করতে হবে।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় সেখানে কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে—তা দিয়ে নয়; বরং কতটা নিরপেক্ষভাবে অপরাধীর বিচার হয়েছে এবং কতজন নিরপরাধ মানুষকে অন্যায় থেকে রক্ষা করা হয়েছে—তা দিয়ে।

আজ বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কার হাতে—আইনের হাতে, নাকি রাজনৈতিক শক্তির হাতে?’

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা।

বাংলাদেশ নিরাপদ হোক।
জঙ্গি-সন্ত্রাসমুক্ত হোক।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।
নিরপরাধ মানুষ মুক্তি পাক, আর প্রকৃত অপরাধীর নিরপেক্ষ বিচার হোক।

এবিএম জাকিরুল হক টিটন

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর