ইরানে অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বাদশ দিনে গড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যকার সমন্বয় ভেঙে দিতে ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘নেটব্লকস’ জানিয়েছে, অনলাইন সেন্সরশিপের মাধ্যমে জনগণের যোগাযোগের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন দেশটির অধিকাংশ প্রদেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট ও বিস্তৃতি
বিশ্ববাজারে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে গত মাসের শেষ দিকে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট শুরু করেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, বিক্ষোভ এখন ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৫টিতে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্তত ৩৪৮টি স্থানে ছোট-বড় সমাবেশের খবর পাওয়া গেছে, যা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আন্দোলনের গতিবিধি ও বর্তমান সংকটের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
ইরান বিক্ষোভ ২০২৬: বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ ও পরিসংখ্যান |
| বিক্ষোভের বর্তমান স্থিতি | ১২তম দিন (টানা)। |
| আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র | তেহরান, বুরুজের্দ, তোনেকাবন ও গিলান-এ-ঘার্ব। |
| ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ | ২১ জন নিহত (এএফপি-র তথ্যমতে)। |
| ইন্টারনেট পরিস্থিতি | দেশজুড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও ডিজিটাল সেন্সরশিপ। |
| বিক্ষোভের বিস্তার | ২৫টি প্রদেশের ৩৪৮টি পৃথক স্থান। |
| সরকারের অভিযোগ | যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইন্ধনের দাবি। |
| আন্দোলনের কারণ | রিয়ালের দরপতন ও আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি। |
সহিংসতা ও হতাহতের খবর
রাজধানী তেহরানের সড়কগুলোতে বিক্ষোভকারীরা অগ্নিসংযোগ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী শহর তোনেকাবনে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে। ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি-র তথ্যমতে, সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তবে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান ও ভিন্ন সুর
ইরানি প্রশাসনের ভেতরে বিক্ষোভ মোকাবিলা নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিরাপত্তা বাহিনীকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের নির্দেশ দিলেও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দাঙ্গাকারীদের ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার কথা বলেছেন। অন্যদিকে, ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেন-এজেই এই বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে দেশবিরোধী কার্যক্রম চালাচ্ছে।
নির্বাসিত শাহজাদার বার্তা
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি এক বার্তায় বিক্ষোভকারীদের সংহতি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শাসকগোষ্ঠী যখনই জনগণের শক্তির কাছে অসহায় বোধ করে, তখনই তারা ইন্টারনেট বন্ধ করে মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করে। তিনি ইরানবাসীকে রাজপথে অবস্থান করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
বর্তমানে ইরান এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে অর্থনৈতিক মন্দা, অন্যদিকে দমনের মুখে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে যায়, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মহল।
