হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চার মূল কাণ্ডারী—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান—এর মুরালাকৃতির ছবি সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সুশীল সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই তেলিয়াপাড়ায় জাতির চার শ্রেষ্ঠ সন্তানের স্মারক অপসারণকে তারা কেবল অসৌজন্যমূলক নয়, বরং ইতিহাসকে অস্বীকার করার শামিল বলে মনে করছেন।
ঘটনার গোড়াপত্তন প্রায় মাস খানেক আগে। মাধবপুর উপজেলার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ বিন কাসেমের মৌখিক নির্দেশে সরকারি অনুদানে নির্মিত এই চত্বর থেকে জাতীয় চার নেতার ছবিগুলো রাতারাতি সরিয়ে ফেলা হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ, ছবিগুলোকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ আখ্যা দিয়ে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মতামত তোয়াক্কা না করেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছিলেন ওই সরকারি কর্মকর্তা। প্রথম দিকে বিষয়টি আড়ালে থাকলেও সম্প্রতি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ঘটনাটি জানাজানি হয় এবং পুরো এলাকা জুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
তৎকালীন ইউএনও বদলি হয়ে যাওয়ার পরপরই ক্ষুব্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সোচ্চার হয়েছেন। ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে মাঠে নেমেছেন ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড’-এর স্থানীয় নেতৃবৃন্দও। তারা সরিয়ে নেওয়া মুরালগুলো অবিলম্বে পূর্বের স্থানে পূর্ণ মর্যাদায় পুনর্স্থাপনের দাবি তুলেছেন। মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে এই চার নেতার ছবি শুধু স্মারক ছিল না, বরং তা ছিল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসের দলিল।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শহীদ তার গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি অনুদান এবং সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধার প্রতীক ছিল এই মুক্তিযোদ্ধা চত্বর। সেখানে জাতির চার মহানায়ককে এভাবে অপমান করা কোনো স্বাধীন দেশে মানা যায় না। কোনো প্রশাসনিক নিয়ম না মেনে কার ইশারায় এই কাজ করা হলো, তার একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি। একই সাথে দায়ীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
শুধু মুক্তিযোদ্ধারাই নন, এই ঘটনার পর সুশীল সমাজ ও স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে মাধবপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. অলিদ মিয়া এক আবেগঘন বার্তায় প্রশ্ন তোলেন, দেশের মুক্তিসংগ্রামে যারা নেতৃত্ব দিলেন, তাদের ছবিগুলো কি সরকারের জন্য কোনো বাধা তৈরি করছিল? তিনি আরও লেখেন, ইতিহাস থেকে নায়কদের নাম বা ছবি মুছে ফেলার চর্চা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। আজ যারা ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়, সময়ের পরিক্রমায় তারাও এই অপসংগতির শিকার হতে পারে। জাতীয় বীরদের সঠিক সম্মান রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিক ও প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব।
এদিকে মুরাল অপসারণ এবং পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে বর্তমান প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া জানতে মাধবপুর উপজেলার বর্তমান ইউএনও মেহেদী হাসানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে প্রশাসনিকভাবে নতুন করে ছবিগুলো স্থাপন করা হবে কি না কিংবা এ ঘটনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে স্থানীয়দের স্পষ্ট বার্তা, ঐতিহাসিক জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে অতি দ্রুত জাতীয় চার নেতার মুরাল ফিরিয়ে না আনলে তারা আরও কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন।









