জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

রানা প্লাজা দুর্নীতি মামলার রায় ফের পেছাল

সাভারের রানা প্লাজা ভবন নির্মাণ ও অনুমোদনসংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় নির্ধারিত দিনে রায় ঘোষণা করা হয়নি। ভবনটির মালিক সোহেল রানাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে চলমান মামলাটি রায়ের পর্যায় থেকে আবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর্যায়ে পাঠিয়েছেন আদালত। ফলে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বহুল আলোচিত এ মামলার নিষ্পত্তি আরও বিলম্বিত হলো।

মঙ্গলবার ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ বি এম তারিকুল কবীরের আদালত আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। এর আগে একই দিনে মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু আসামিপক্ষ নতুন করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের আবেদন করলে আদালত তা বিবেচনা করে মামলাটি ফের যুক্তিতর্কের পর্যায়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন।

এর ফলে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের আবারও মামলার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আদালতে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হলো। যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আদালত নতুন করে রায়ের তারিখ নির্ধারণ করবেন।

মামলায় আট আসামি

সোহেল রানা ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম এবং লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আবদুল মোত্তালিব।

আসামিদের সবাই একই অবস্থায় নেই। সোহেল রানা এ মামলায় জামিনে থাকলেও রানা প্লাজা ধসে প্রাণহানির ঘটনায় করা হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। মঙ্গলবার তাঁকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। মাহবুবুর রহমান ও ফারজানা ইসলাম পলাতক। অন্য আসামিরা জামিনে রয়েছেন এবং আদালতে হাজিরা দিয়েছেন।

যে ভবনধস বদলে দেয় বাংলাদেশের শিল্পনিরাপত্তার চিত্র

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভবনটি ধসে পড়ায় সেখানে থাকা পোশাকশ্রমিকসহ বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন। দুর্ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্পদুর্ঘটনাগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

ওই ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং আহত হন আরও বহু শ্রমিক। দুর্ঘটনার পর শুধু ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তাই নয়, ভবনের নকশা অনুমোদন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, ব্যবহার পরিবর্তন এবং পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমোদন নিয়েও ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দেয়।

এরপর ভবন নির্মাণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করে।

কীভাবে এগোয় দুর্নীতির মামলা

নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৫ জুন সাভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মামলার আসামি ও অভিযোগের পরিধিতে পরিবর্তন আসে।

প্রাথমিক মামলায় সোহেল রানাকে আসামি করা হয়নি। কারণ, ভবনটির মালিকানা তাঁর বাবার নামে ছিল। তবে পরবর্তী অধিকতর তদন্তে ভবনটির নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সোহেল রানার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তাঁকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অধিকতর তদন্ত শেষে সোহেল রানা, তাঁর মা-বাবাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরে অভিযোগ গঠনের সময় আটজনকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং ১০ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সোহেল রানার মা ও বাবার মৃত্যু হলে তাঁদেরও মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

নকশা ও ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ

মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ‘রানা প্লাজা’ নামে ছয়তলা একটি শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল নকশা অনুমোদন করা হয়েছিল। পরে ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি ভবনটির ওপর আরও চারতলা নির্মাণের অনুমোদন চাওয়া হয়।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, শপিং কমপ্লেক্স হিসেবে নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে ভবনটিতে পাঁচটি পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ ভবনের পরিকল্পিত ব্যবহার ও পরবর্তী ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছিল বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

নকশা অনুমোদন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলাটির বিচার এগিয়েছে।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া

২০১৭ সালের ২১ মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। বিচারপর্বে রাষ্ট্রপক্ষের ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এরপর মামলাটি রায় ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছায়।

কিন্তু রায়ের জন্য নির্ধারিত দিনেই আসামিপক্ষের আবেদনে মামলাটি আবার যুক্তিতর্কের পর্যায়ে ফেরত যাওয়ায় নতুন করে শুনানি হবে। ফলে দীর্ঘদিনের এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্টদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলার পাশাপাশি ভবন নির্মাণ ও অনুমোদনসংক্রান্ত দুর্নীতির এই মামলাটিও দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন। ভবনধসের পর নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ভবন অনুমোদন এবং শিল্পকারখানার নিরাপত্তা নিয়ে দেশে যে বড় ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে মামলাটির বিচারিক অগ্রগতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এখন নতুন যুক্তিতর্ক শেষে আদালত কবে রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণ করেন, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর