রাজবাড়ী প্রতিনিধি: ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন উত্তাল সারা দেশ। বিশেষ করে রাজবাড়ী-১ (সদর ও গোয়ালন্দ) আসনটি বর্তমানে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সোমবার বিকেলে রাজবাড়ীর ঐতিহাসিক শহীদ খুশি রেলওয়ে ময়দানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের শেষ নির্বাচনী গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশটি কার্যত এক বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেয়, যা রাজবাড়ীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
Table of Contents
আবেগঘন বক্তব্যে জনতাকে স্পর্শ
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রবীণ এই জননেতা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। শৈশব থেকে রাজনীতির মাঠে থাকা খৈয়ম তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমার কথা স্মরণ করে বলেন,
“আমার কৈশোর ও যৌবনের প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে এই জনপদের মেহনতি মানুষের সঙ্গে। রিকশাচালক থেকে শুরু করে জেলে, তাঁতি ও শ্রমজীবী মানুষের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হয়েছি আমি। আপনাদের ভালোবাসাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমি আমার জীবন উৎসর্গ করেছি।”
তিনি তার ব্যক্তিগত সততার ওপর জোর দিয়ে বলেন যে, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনোই দুর্নীতির আশ্রয় নেননি বা কারো অনিষ্ট করেননি। তিনি কেবল মানুষের হৃদয়ে তার কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকার আকুতি জানান।
উন্নয়ন ও আন্দোলনের পটভূমি
আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মকে রাজবাড়ীর মানুষ চেনে ‘আধুনিক রাজবাড়ীর রূপকার’ হিসেবে। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় খৈয়ম রেকর্ড তিনবার রাজবাড়ী পৌরসভার প্রধান (চেয়ারম্যান ও মেয়র) নির্বাচিত হয়েছেন। তার আমলেই শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও রাস্তাঘাটের আমূল পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ী সদরের অবকাঠামো উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন।
বর্তমানে তিনি ‘পদ্মা ব্যারেজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি’-র সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বেকারত্ব দূরীকরণ ও নদীভাঙন রোধকে তিনি এবারের নির্বাচনের প্রধান অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
রাজবাড়ী-১ আসনের রাজনৈতিক প্রোফাইল ও বর্তমান চিত্র
নির্বাচনী সমীকরণ বুঝতে নিচের তথ্যবহুল টেবিলটি লক্ষ্য করুন:
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| আসন নম্বর | রাজবাড়ী-১ (২০৯) |
| অন্তর্ভুক্ত এলাকা | রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলা |
| প্রধান প্রার্থী (বিএনপি) | আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম (ধানের শীষ) |
| প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী | অ্যাডভোকেট মো. নূরুল ইসলাম (জামায়াতে ইসলামী) |
| নির্বাচনী ইশতেহারের মূল লক্ষ্য | পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ, ২য় পদ্মা সেতু, নদী শাসন ও বেকারত্ব মুক্তি |
| ঐতিহাসিক সাফল্য | খৈয়মের নেতৃত্বে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ব্যাপক গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন |
নির্বাচনী উত্তাপ ও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
গণসমাবেশ শেষে একটি বিশাল বর্ণাঢ্য মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি রাজবাড়ী শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শকে ধারণ করে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের লড়াইটি মূলত উন্নয়ন বনাম সাংগঠনিক শক্তির। যদিও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে, তবে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের ব্যক্তি ইমেজ এবং পদ্মা পাড়ের মানুষের প্রতি তার দীর্ঘদিনের মমত্ববোধ তাকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ কারাবরণ ও জেল-জুলুম উপেক্ষা করে খৈয়ম যেভাবে রাজবাড়ীর বিএনপিকে সুসংগঠিত রেখেছেন, তার প্রতিফলন দেখা গেছে সোমবারের এই বিশাল জনস্রোতে।
রাজবাড়ী-১ আসনের এই লড়াই কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি পদ্মা পাড়ের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা এবং আধুনিক ও কর্মসংস্থানমুখী রাজবাড়ী গড়ার একটি নতুন সূচনালগ্ন। আগামী নির্বাচনে ভোটাররা তাদের রায় দিয়ে নির্ধারণ করবেন এই জনপদের আগামী দিনের ভাগ্য।
