শরীয়তপুরের নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেনকে তাঁর কার্যালয়ে বসে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার ৩৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এর পরদিনই মতিউর রহমানকে দলীয় সব পদ থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে শরীয়তপুর জেলা বিএনপি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার রাতে নড়িয়া থানার ওসির কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ কামরুল হাসানের সই করা এক চিঠিতে মতিউর রহমানকে সাময়িক বহিষ্কারের বিষয়টি জানানো হয়।
দলীয় চিঠিতে বলা হয়েছে, দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ, অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে এ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিলবোর্ড স্থাপন নিয়ে বিরোধ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকেলে নড়িয়া উপজেলার নোয়াদ্দা বাংলাবাজার এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণার জন্য বিলবোর্ড স্থাপন করতে যান মতিউর রহমান। তিনি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে আগ্রহী। বিলবোর্ড স্থাপনের সময় জমির মালিক আবু তালেব বাধা দিলে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
পরে আবু তালেবের ভাই আবদুস সালাম ঘটনাস্থলে গেলে তাঁকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে এবং ঘটনা তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায়।
পুলিশ সূত্রের দাবি, আবদুস সালামকে গ্রেপ্তারের জন্য মতিউর রহমান চাপ দিতে থাকেন। এর আগে তিনি বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করেন। ওই মামলায় আবদুস সালামকেও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
তবে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে গ্রেপ্তার না করায় ওসির সঙ্গে মতিউর রহমানের বিরোধ তৈরি হয় বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
ওসির কক্ষে হুমকির অভিযোগ
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মতিউর রহমানকে নড়িয়া থানার ওসির কক্ষে বসে কথা বলতে দেখা যায়। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘বাহার (বাহার মিয়া, নড়িয়া থানার সাবেক ওসি) গেছেন যে পথে, আপনিও যাবেন সে পথে।’
ভিডিওতে মতিউর রহমান আরও অভিযোগ করেন, তাঁর করা মামলায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার না করে পুলিশ নিজেদের ইচ্ছেমতো লোকজনকে গ্রেপ্তার করছে। তিনি এ বিষয়ে পুলিশ সুপার (এসপি) ও উপমহাপরিদর্শককে (ডিআইজি) জানানোর কথাও বলেন।
একপর্যায়ে তাঁকে ওসির টেবিল চাপড়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। দরজার কাছে গিয়ে তিনি আবার বলেন, ‘আপনি যদি ওরে (আবদুস সালাম) ছাইড়া দেন, ওই বাহার গেছে যেই পথে, আপনিও যাইবেন হেই পথে—বইলা দিলাম।’
ভিডিওতে ওসি আনোয়ার হোসেনকে বলতে শোনা যায়, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এবং ওই ঘটনায় আবদুস সালামের সম্পৃক্ততা থাকলে তাঁকে মামলায় চালান দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ওসি আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নড়িয়া থানায় এর আগে ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বাহার মিয়া। প্রায় দুই মাস আগে তাঁকে ওই থানা থেকে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশের ভাষ্য কী
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) মহিউদ্দিন মিরাজ বলেন, তাঁদের কাছে যে অভিযোগ এসেছিল, সেটি যাচাই করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি সাধারণ হাতাহাতির এবং হাতাহাতি হয়েছিল আবদুস সালামের ভাইয়ের সঙ্গে। এ কারণে আবদুস সালামকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ওসিকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, আবু তালেব ও আবদুস সালামকে মারধর এবং পুলিশ দিয়ে তাঁদের হয়রানি করার চেষ্টার অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার বিকেলে ঘড়িষার বাজারে বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
আবদুস সালামও মতিউর রহমানের আচরণের নিন্দা জানিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছেন।
বিএনপির সাংগঠনিক ব্যবস্থা
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর শরীয়তপুর জেলা বিএনপি দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়। দলের সহসভাপতি শাহ আবদুস সালাম বলেন, বিষয়টি তাঁরা খতিয়ে দেখছেন। সরকারি কর্মকর্তার ওপর চাপ সৃষ্টি বা তাঁকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই সঠিক হয়নি। এ কারণে মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে পুরো ঘটনার বিষয়ে মতিউর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটিতে এখন দুটি বিষয় আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমটি হলো নির্বাচনী প্রচারণার বিলবোর্ড স্থাপনকে কেন্দ্র করে আবু তালেব ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে বিরোধ ও হাতাহাতির অভিযোগ। দ্বিতীয়টি হলো ওই ঘটনার পর একজন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর গ্রেপ্তারের জন্য চাপ প্রয়োগ এবং তাঁকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ।
পুলিশ জানিয়েছে, হাতাহাতির ঘটনা তারা যাচাই করেছে এবং সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে থানার ওসিকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মতিউর রহমানকে সাময়িক বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।









