হিন্দি চলচ্চিত্রের গানের জগতে ইরশাদ কামিল এমন এক গীতিকার, যাঁর লেখা শুধু পর্দার গল্পকে এগিয়ে নেয় না, শ্রোতার ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অনুভূতির সঙ্গেও সহজে মিশে যায়। প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা, আকাঙ্ক্ষা কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোনো জায়গায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা—তাঁর গানে এসব অনুভূতি বারবার ভিন্ন ভিন্ন রূপে ফিরে আসে। তাঁর গানের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই, সাধারণ মানুষের চেনা অনুভূতিকে তিনি এমনভাবে শব্দে ধরেন, যা শুনলে মনে হয় কথাগুলো যেন নিজেরই।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে কাজ করা ইরশাদ কামিলের লেখায় তাঁর পাঞ্জাবি শিকড়ের প্রভাবও স্পষ্ট। শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং নিজের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে তাঁর অনেক গানে একটি নির্দিষ্ট ভূগোলের উপস্থিতি থাকলেও অনুভূতিগুলো থেকে যায় সর্বজনীন। যে শ্রোতা পাঞ্জাবের মানুষ নন, তিনিও সেই গানে নিজের শহর, নিজের বাড়ি কিংবা ফেলে আসা কোনো জায়গার স্মৃতি খুঁজে নিতে পারেন।
ইরশাদ কামিলের গীতিকবিতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ভাষার স্বাভাবিকতা। তিনি জটিল শব্দের ভারে অনুভূতিকে ঢেকে দেন না। বরং পরিচিত কথ্য ভাষার সঙ্গে কবিতার সৌন্দর্য মিশিয়ে এমন এক ভঙ্গি তৈরি করেন, যা একই সঙ্গে সহজ এবং অর্থবহ। এই কারণে তাঁর গান চরিত্রের আবেগ প্রকাশ করার পাশাপাশি শ্রোতার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতারও অংশ হয়ে ওঠে।
পরিচালক ইমতিয়াজ আলীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সৃষ্টিশীল সম্পর্ক এই বৈশিষ্ট্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। তাঁদের যৌথ কাজের মধ্যে প্রেমের পাশাপাশি ভ্রমণ, বিচ্ছিন্নতা, আত্মপরিচয় এবং নিজের কাছে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইমতিয়াজ আলী, এ আর রহমান ও ইরশাদ কামিলের সৃষ্টিশীল ত্রয়ী ‘রকস্টার’, ‘তামাশা’ এবং ‘অমর সিং চমকিলা’র মতো কাজেও একসঙ্গে দেখা গেছে। ২০২৬ সালের ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ চলচ্চিত্রেও তাঁদের এই সহযোগিতা আবার সামনে এসেছে। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেছেন এ আর রহমান এবং গানের কথা লিখেছেন ইরশাদ কামিল।
‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’য় ‘ঘরে ফেরা’ ভাবনাটি আরও সরাসরি হয়ে উঠেছে। ছবিটির গল্প ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পটভূমিতে নির্মিত এবং হারিয়ে যাওয়া ঘর, স্মৃতি, ভালোবাসা ও বিচ্ছেদের অনুভূতি এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছবিটির সংগীতেও সেই আবেগের প্রতিফলন রয়েছে। ‘ক্যা কমাল হ্যায়’, ‘মাসকারা’, ‘ইশক মস্তানা’, ‘ভো নেহি’সহ অ্যালবামের গানগুলোর কথা লিখেছেন ইরশাদ কামিল।
এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে ইরশাদ কামিলের ব্যক্তিগত শিকড়ের একটি বিশেষ যোগও রয়েছে। ‘মাসকারা’ গানের শুটিং করা হয়েছিল পাঞ্জাবের মালেরকোটলায়, যা ইরশাদ কামিলের নিজের শহর। পরিচালক ইমতিয়াজ আলী জানিয়েছেন, সেখানে গানটির শুটিং তাঁর জন্য আবেগঘন অভিজ্ঞতা ছিল। ছবির গল্পেও অবিভক্ত পাঞ্জাবের সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং সেই সময়ের মানুষের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’র ক্ষেত্রে ‘ঘর’ তাই শুধু একটি বাড়ি বা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থান নয়। দেশভাগের গল্পে ঘর মানে হয়ে ওঠে স্মৃতি, পরিচয়, সম্পর্ক এবং হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবী। এই ধারণাই ইরশাদ কামিলের লেখার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়। তাঁর গানে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনও প্রিয় মানুষের কাছে, কখনও শৈশবের কাছে, আবার কখনও নিজের ভেতরের কোনো হারানো জায়গার কাছে ফিরে যাওয়ার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
এখানেই কবীরের ভাবনার সঙ্গেও তাঁর সাম্প্রতিক কাজের একটি যোগসূত্র তৈরি হয়। মানুষের নিজের ভেতরে ফিরে তাকানো, বাহ্যিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে আত্মপরিচয় খোঁজা এবং জীবনের গভীর অর্থ উপলব্ধি করার যে দর্শন কবীরের ভাবনায় রয়েছে, ইরশাদ কামিলের গীতিকবিতায় তার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। ফলে ‘ফিরে আসা’ তাঁর কাছে শুধু কোনো স্থানে ফিরে যাওয়া নয়; কখনও তা নিজের সত্তার কাছেও ফিরে আসার ইঙ্গিত।
ইরশাদ কামিলের লেখার সঙ্গে এ আর রহমানের সুরের সমন্বয়ও এই আবেগকে আরও শক্তিশালী করে। রহমানের সুর যেখানে অনুভূতির বিস্তার তৈরি করে, সেখানে কামিলের শব্দ সেই অনুভূতিকে নির্দিষ্ট ভাষা দেয়। কখনও শব্দ খুব কোমল, কখনও বিষণ্ণ, আবার কখনও তার মধ্যে থাকে দীর্ঘ অপেক্ষার স্বর। দুজনের এই সৃষ্টিশীল সমন্বয় বহু গানে শ্রোতার মনে দীর্ঘস্থায়ী আবেশ তৈরি করেছে।
‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’কে ঘিরে এই ভাবনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ছবিটির প্রচারের সময়ও দেশভাগের কারণে হারিয়ে যাওয়া ঘর ও মানুষের আবেগ সামনে এসেছে। জুন মাসে অমৃতসরের আত্তারি সীমান্তে ছবিটির সংগীত ঘিরে একটি অনুষ্ঠানে ইমতিয়াজ আলী বলেছিলেন, দেশভাগ শুধু ঘর ও জীবন কেড়ে নেয়নি, মানুষের হৃদয়ও ভেঙে দিয়েছিল।
তবে ইরশাদ কামিলের গানে ঘরের টান কেবল দেশভাগ বা পাঞ্জাবের স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গানের আবেদন আরও ব্যক্তিগত। শ্রোতার নিজের জীবনে ‘ঘর’ বলতে যা বোঝায়, গান শুনতে শুনতে সেটিই সামনে চলে আসে। কারও কাছে তা শৈশবের উঠোন, কারও কাছে বাবা-মায়ের মুখ, কারও কাছে পুরোনো কোনো সম্পর্ক, আবার কারও কাছে এমন একটি জায়গা, যেখানে বহুদিন যাওয়া হয়নি।
এই ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতাই ইরশাদ কামিলকে আলাদা করে। তিনি শ্রোতাকে সরাসরি বলে দেন না, কী অনুভব করতে হবে। বরং এমন শব্দ ও পরিস্থিতি তৈরি করেন, যার মধ্যে শ্রোতা নিজের অভিজ্ঞতা বসিয়ে নিতে পারেন। একটি চলচ্চিত্রের গান তখন আর শুধু চলচ্চিত্রের গান থাকে না; তা হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ।
তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারও দেখিয়েছে, জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গানের মধ্যেও কবিতার গভীরতা ধরে রাখা সম্ভব। পাঞ্জাবি শিকড়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কথ্য ভাষার ব্যবহার, কবিতার প্রতি অনুরাগ এবং ইমতিয়াজ আলী ও এ আর রহমানের মতো সৃষ্টিশীল সহযোগীদের সঙ্গে দীর্ঘ কাজ—সব মিলিয়ে ইরশাদ কামিলের গানে একটি স্বতন্ত্র আবেগের ভাষা তৈরি হয়েছে।
তাই তাঁর গান শুনে ‘ঘরের’ কথা মনে পড়ার কারণ কেবল গানের বিষয়বস্তু নয়। তাঁর শব্দের মধ্যে থাকে পরিচিত মানুষের উষ্ণতা, হারানো সময়ের স্মৃতি এবং ফিরে যাওয়ার এক নীরব আকাঙ্ক্ষা। সেই অনুভূতিই শ্রোতাকে গানের চরিত্রের সঙ্গে নিজের জীবনকে মিলিয়ে নিতে সাহায্য করে।
আর সেখানেই ইরশাদ কামিলের গীতিকবিতার সবচেয়ে বড় সাফল্য—তিনি দূরের কোনো গল্পকে এমনভাবে লিখতে পারেন, যা শেষ পর্যন্ত শ্রোতার নিজের গল্প হয়ে ওঠে। গান শেষ হয়ে গেলেও থেকে যায় একটি অনুভূতি: কোথাও একজন মানুষ, একটি জায়গা কিংবা একটি সময় আছে, যার কাছে আমরা বারবার ফিরে যেতে চাই।









