যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ ঐতিহাসিক বাণিজ্যচুক্তি: শুল্ক সুবিধা ও নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। গত সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় দুই দেশের মধ্যে এক ঐতিহাসিক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আরোপিত ‘পাল্টা শুল্ক’ (Reciprocal Tariff) ১ শতাংশ হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন। এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা আগের চেয়ে সহজতর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চুক্তির মূল বিষয়বস্তু ও শুল্ক কাঠামো

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের সাধারণ পণ্য রপ্তানির ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে তৈরি পোশাক খাতের জন্য। নতুন চুক্তির শর্তানুসারে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা (Cotton) এবং কৃত্রিম তন্তু (Synthetic Fiber) ব্যবহার করে বাংলাদেশে যে পোশাক তৈরি হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না। অর্থাৎ, মার্কিন কাঁচামালে উৎপাদিত পোশাক এখন থেকে দেশটিতে শুল্কমুক্ত (পাল্টা শুল্কের ক্ষেত্রে) প্রবেশের সুবিধা পাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামোর বিবর্তন:

সময়কালপাল্টা শুল্কের হারসাধারণ শুল্কমোট শুল্ক হার
এপ্রিল ২০২৫ (প্রাথমিক ঘোষণা)৩৭%১৫%৫২%
জুলাই ২০২৫৩৫%১৫%৫০%
আগস্ট ২০২৫২০%১৫%৩৫%
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বর্তমান চুক্তি)১৯%*১৫%৩৪%*

*বিশেষ দ্রষ্টব্য: মার্কিন তুলায় তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে ১৯% পাল্টা শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফ থাকবে।

ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে চুক্তি স্বাক্ষর

ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বিশেষ পরিস্থিতির কারণে বাণিজ্য উপদেষ্টা এবং বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান ঢাকা থেকে ভার্চ্যুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকীও ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ক্ষণের সাক্ষী হন। তবে সশরীরে উপস্থিত থেকে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল।

রপ্তানিকারকদের প্রতিক্রিয়া

এই চুক্তিকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা। হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের খবর। আমরা আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানি করি। এখন এই সুবিধা পাওয়ার ফলে আমদানির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং আমাদের রপ্তানি সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।” তিনি মনে করেন, এই শুল্ক ছাড়ের ফলে বৈশ্বিক মন্দার বাজারেও বাংলাদেশ তার রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারবে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও সাবধানতা

তবে চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কিছু আইনি ও কৌশলগত প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে এমন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দায়ভার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর বর্তাবে। চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশকে কোনো রাজনৈতিক বা কৌশলগত শর্ত পূরণ করতে হবে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বর্তমান চিত্র

বর্তমানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য এবং আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের সামগ্রী। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে ভারসাম্য আনতে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল, ভুট্টা এবং উরোজাহাজের যন্ত্রাংশের পাশাপাশি এলএনজি আমদানিতে জোর দিয়েছে।

আগামীকাল বেলা আড়াইটায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জাতির সামনে তুলে ধরা হবে।