রাজধানীর সন্নিকটে সাভারের দত্তপাড়া এলাকায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত বাড়িওয়ালা আবদুল বারেককে (৫৮) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) এক কর্মচারীর শিশু কন্যাকে তার বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে ধর্ষণের মতো এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। গত ১৪ এপ্রিল (মঙ্গলবার) দিবাগত রাতে সাভার মডেল থানা পুলিশের একটি চৌকস দল তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে ধামরাই এলাকা থেকে পলাতক বারেককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও লোমহর্ষক বর্ণনা
মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটে গত ৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের দত্তপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে। ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা-মা উভয়েই ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কর্মচারী হিসেবে কর্মরত। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তারা যখন নিজ নিজ কর্মস্থলে ছিলেন, তখন তাদের দুই শিশুকন্যা বাসায় টেলিভিশন দেখছিল। এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশী ও বাড়িওয়ালা আবদুল বারেক ওই বাসায় প্রবেশ করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বারেক প্রথমে শিশুটির চার বছর বয়সী ছোট বোনকে ১০ টাকা দিয়ে চকোলেট কেনার প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দেয়। ছোট বোনটি ঘর থেকে বের হওয়া মাত্রই বারেক ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয় এবং সাত বছর বয়সী বড় বোনের ওপর পাশবিক যৌন নির্যাতন চালায়। রাত আনুমানিক ৮টার দিকে শিশুটির মা কাজ থেকে ফিরে দেখেন তার মেয়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদছে। মাকে দেখা মাত্রই শিশুটি আতঙ্কে জড়িয়ে ধরে এবং বাড়িওয়ালা বারেকের ঘৃণ্য অপকর্মের কথা প্রকাশ করে। মা লক্ষ্য করেন শিশুটির শরীর ও পরিধেয় বস্ত্র রক্তাক্ত অবস্থায় রয়েছে।
অপরাধ স্বীকার ও অভিযুক্তের পলায়ন
যন্ত্রণাকাতর শিশুকে নিয়ে মা তাৎক্ষণিকভাবে বাড়িওয়ালা বারেকের ঘরে যান এবং তার ও তার স্ত্রীর কাছে কৈফিয়ত চান। সে সময় বারেক নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে এবং স্থানীয়ভাবে মান-সম্মানের দোহাই দিয়ে বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য অনুরোধ করে। পরবর্তীতে শিশুটির বাবা কর্মস্থল থেকে ফিরে বিস্তারিত শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং বারেকের ঘরে গেলে সে ও তার স্ত্রী পা ধরে ক্ষমা ভিক্ষা করতে থাকেন। এই সুযোগে ভুক্তভোগীর বাবা ঘরটির বাইরের ছিটকিনি আটকে দিয়ে প্রতিবেশীদের ডাকতে গেলে বারেকের স্ত্রী দরজা খুলে দেয় এবং অভিযুক্ত বারেক দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
চিকিৎসা ও আইনি তৎপরতা
ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের নজরে আসলে প্রক্টরসহ প্রক্টরিয়াল বডি ও নিরাপত্তা বিভাগের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সে করে শিশুটিকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ওসিসিতে (ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) স্থানান্তর করা হয়। গত ১৩ এপ্রিল ভুক্তভোগী শিশুটি আদালতে উপস্থিত হয়ে বিচারকের কাছে নিজের জবানবন্দি প্রদান করেছে।
ঘটনার সারসংক্ষেপ ও তথ্যচিত্র
উক্ত চাঞ্চল্যকর ঘটনার মূল তথ্যসমূহ নিচে সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| ঘটনার স্থান | দত্তপাড়া, বিরুলিয়া, সাভার, ঢাকা। |
| ভুক্তভোগীর পরিচয় | বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীর সন্তান (বয়স: ৭ বছর)। |
| প্রধান অভিযুক্ত | আবদুল বারেক (৫৮), পেশায় বাড়িওয়ালা। |
| ঘটনার সময় | ৬ এপ্রিল, ২০২৬ (সোমবার সন্ধ্যা)। |
| গ্রেফতারের স্থান | ধামরাই উপজেলা এলাকা। |
| গ্রেফতারের তারিখ | ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ (মঙ্গলবার রাত)। |
| চিকিৎসা সহায়তা | এনাম মেডিকেল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। |
| তদন্তকারী কর্মকর্তা | এসআই আল আমিন (ইনচার্জ, বিরুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ি)। |
পুলিশের বক্তব্য ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বারেক তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বিরুলিয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই আল আমিন জানান, ঘটনার পর থেকেই আসামি আত্মগোপনে ছিল। পুলিশের বিশেষ অভিযানে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তাকে ধামরাই থেকে আটক করা হয়। বর্তমানে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সাভারের স্থানীয় জনপদে এই পৈশাচিক ঘটনাটি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি পরিবার এবং স্থানীয় সচেতন মহল এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অভিযুক্ত বারেকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি তুলেছেন। এই ঘটনাটি রাজধানীর উপকণ্ঠের ভাড়া বাড়িগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশাসন জানিয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলার চার্জশিট দাখিল করা হবে যাতে ভুক্তভোগী পরিবারটি ন্যায়বিচার পায়।
