সিলেটের জকিগঞ্জে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বোরহান উদ্দিন ওরফে শফিকে (৫৯) পিটিয়ে হত্যার পর প্রমাণ লোপাট করতে তার লাশে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল ঘাতকরা। এই বর্বরোচিত ঘটনার নেপথ্যে উঠে এসেছে একটি সাধারণ মোটরসাইকেল নিয়ে বিরোধের জেরে পরিকল্পিত খুনের কাহিনী। ঘটনায় জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের মধ্যে দুজন ইতোমধ্যে আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছেন।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নিখোঁজ সংবাদ
নিহত বোরহান উদ্দিন সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার হাবিবুর আশিঘর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি সিলেট নগরের আম্বরখানা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। গত ৩০ জানুয়ারি তিনি সিলেট থেকে মোটরসাইকেলে করে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। তার কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে সিলেটের বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ৩ ফেব্রুয়ারি জকিগঞ্জের সুলতানপুর ইউনিয়নের কোনারবন্দ হাওর থেকে একটি অজ্ঞাতনামা দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় মরদেহটি প্রবাসী বোরহান উদ্দিনের বলে নিশ্চিত করে।
হত্যাকাণ্ডের কারণ ও মূল রহস্য
আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দি এবং পুলিশি তদন্ত থেকে জানা যায়, এই হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল একটি মোটরসাইকেল। বোরহান উদ্দিন যুক্তরাজ্যে থাকা অবস্থায় তার মালিকানাধীন মোটরসাইকেলটি সাব্বির আহমেদ নামক এক যুবককে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। সম্প্রতি বোরহান দেশে ফিরে মোটরসাইকেলটি অন্য একজনকে দেওয়ার জন্য সাব্বিরের কাছ থেকে ফেরত চান। মোটরসাইকেলটি ফেরত দিতে দেরি হওয়ায় এবং বোরহানের পক্ষ থেকে ক্রমাগত চাপের সৃষ্টি হলে সাব্বির ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
আসামিরা স্বীকার করেছেন যে, ২৫ জানুয়ারি তারা বোরহানকে হত্যার নীল নকশা তৈরি করেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩০ জানুয়ারি তাকে কৌশলে জকিগঞ্জের নির্জন হাওর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সাব্বির, মেহরাজ এবং আরও একজন মিলে বোরহানকে ঘিরে ধরেন। তারা তাকে এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকেন এবং একপর্যায়ে মোটরসাইকেলের শক্ত হেলমেট দিয়ে তার মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করেন। প্রচণ্ড আঘাতেই বোরহানের মৃত্যু নিশ্চিত হয়। এরপর অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলতে এবং পরিচয় গোপন করতে তারা মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেয়।
মামলার অগ্রগতি ও গ্রেপ্তারকৃতদের বিবরণ
এই ঘটনায় নিহতের বোন শাহ আসমা জাহান বাদী হয়ে জকিগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি পরবর্তীতে সিলেট জেলা ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হলে তদন্তে দ্রুত গতি আসে।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের তালিকা ও অবস্থান:
| আসামির নাম | বয়স | গ্রাম/এলাকা | গ্রেপ্তারের স্থান | জবানবন্দির স্থিতি |
| সাব্বির আহমেদ | ২১ | ইলাবাজ, জকিগঞ্জ | জকিগঞ্জ | স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন |
| সৈয়দ মেহরাজ উজ সামাদ | ২০ | ওসমানীনগর, সিলেট | পূর্বাচল, নারায়ণগঞ্জ | স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন |
| তাহিরুল হক | ২০ | ঘেচুয়া, জকিগঞ্জ | লালাগ্রাম, জকিগঞ্জ | তদন্তাধীন ও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ |
পুলিশের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসাইন জানান, এটি একটি সম্পূর্ণ ‘ক্লু-লেস’ মামলা ছিল। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তদন্ত চালিয়ে আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে। গ্রেপ্তারকৃত তাহিরুল হকের কাছ থেকে নিহত বোরহানের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে।
বর্তমানে এই মামলায় আরও একজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সাব্বির ও মেহরাজ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। প্রবাসী এই নাগরিকের এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং নিহতের পরিবার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এই মামলার বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে।
