যশোরে সারের ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চরম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। জেলায় মোট সারের ডিলারের সিংহভাগই বিএনপি নেতাকর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনুমোদিত ৯৮ জন ডিলারের মধ্যে ৬৫ জনই সরাসরি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এমনকি কিছু ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে বিএনপি নেতাদের বয়োবৃদ্ধ মা, স্ত্রী এবং অস্তিত্বহীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার নীতিমালা অনুযায়ী পূর্বে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা থাকা আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয়নি। চৌগাছা উপজেলায় ডিলারশিপ পাওয়া মেসার্স চৌগাছা ট্রেডার্সের মালিক সেলিম রেজা আউলিয়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে টাইলস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং তিনি উপজেলা পৌর বিএনপির সভাপতি। একই উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী রহিমা আক্তার লিপি, অথচ সেখানে আগে থেকেই সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চারজন আবেদনকারী ছিলেন। হাকিমপুর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া মেসার্স নিশান ট্রেডার্সের মালিক উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ষাটোর্ধ্ব মা আমেনা বেগম। অথচ তাদের কেউই কখনো সার ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না।
যশোর জেলায় সার ডিলার নিয়োগ ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগের পরিসংখ্যান
| খাতের বিবরণ | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| জেলায় মোট অনুমোদিত সারের ডিলার | ৯৮ জন |
| ডিলারশিপ পাওয়া বিএনপি ও তাদের স্বজনদের সংখ্যা | ৬৫ জন |
| ডিলারশিপের জন্য মোট আবেদন করা ইউনিয়ন ও পৌরসভা | ১০১টি (৯৩ ইউনিয়ন ও ৮ পৌরসভা) |
| যশোর সদরে অনুমোদিত ডিলার | ১৬ জন |
| মণিরামপুরে অনুমোদিত ডিলার | ১৭ জন |
| শার্শায় অনুমোদিত ডিলার | ১২ জন |
| কেশবপুরে অনুমোদিত ডিলার | ১২ জন |
| অভয়নগরে অনুমোদিত ডিলার | ৯ জন |
| চৌগাছায় অনুমোদিত ডিলার | ১১ জন |
| বাঘারপাড়ায় অনুমোদিত ডিলার | ৯ জন |
| ঝিকরগাছায় অনুমোদিত ডিলার | ১২ জন |
| অনিয়মের অভিযোগে তদন্তাধীন ডিলারের সংখ্যা | ২১ জন |
| তদন্ত পরিচালনা করছে যে কমিটি | ৩ সদস্যের জেলা কমিটি |
মণিরামপুর ও বাঘারপাড়া উপজেলাতেও একই ধরনের দলীয়করণের চিত্র দেখা গেছে। মণিরামপুরের মেসার্স নাফিস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির ছেলে, আর নেহালপুরের মেসার্স সরদার এন্টারপ্রাইজের মালিক উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের খালাতো ভাই। এমনকি চৌগাছার নারায়ণপুর ইউনিয়নে ডিলার মনোনীত আমেনা ট্রেডার্সের প্রকৃত কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। দোকানঘর হিসেবে যে ঠিকানা দেখানো হয়েছে, সেখানে বাস্তবে একটি এনজিওর কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং ভবন মালিকের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে সার ব্যবসা পরিচালনা করেও ডিলারশিপ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। মণিরামপুরের এক সার ব্যবসায়ী জানান, ২০০৮ সাল থেকে নিয়মিত ব্যবসা করা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরিচয়ের অভাবে তাকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে মণিরামপুরের দুর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নে ডিলার পাওয়া এক ব্যক্তির স্বামী মাদক মামলার আসামি হিসেবে সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়ার পর স্থানীয় নেতাকর্মীরা তীব্র বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন।
সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির প্রতিবাদে যশোরের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একপেশে সিদ্ধান্তের অভিযোগ তুলেছে জামায়াতে ইসলামী। তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দাবি করেছেন, নেতাকর্মীরা আবেদন বেশি করায় ডিলারশিপও বেশি পেয়েছেন এবং প্রশাসন নিয়মতান্ত্রিক উপায়েই তালিকা চূড়ান্ত করেছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে ২১ জন ডিলারের বিরুদ্ধে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।








