বেতন পাওয়ার মাস পার হতে না হতেই অনেকের পকেট শূন্য হয়ে পড়ে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আনাস প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা সঞ্চয়ের চেষ্টা করলেও নিত্যদিনের খরচ মেটাতে গিয়ে প্রায়ই সেই জমানো টাকা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হন। মাসের পঁচিশ তারিখের আগেই তার পকেটের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। মাস শেষের বাকি দিনগুলো পার করতে তাকে অনেক সময় মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবার মাধ্যমে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়। তিন মাস মেয়াদী এসব ঋণের বিপরীতে চড়া সুদ দিতে হয়। পরবর্তী মাসে বেতন পাওয়ার পর সেই ঋণ পরিশোধ করতেই বাজেটের ওপর নতুন করে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়।
আনাস জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যেভাবে বাড়ছে, সেই তুলনায় বেতন বাড়ছে না। প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে বড় জোর দুই থেকে চার হাজার টাকার মতো বেতন বাড়ে, যা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই যথেষ্ঠ নয়। একই ধরনের সংকটের কথা জানান আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী নিলয়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিতে তিনি বিকল্প আয়ের কথা ভাবলেও কাজের চাপ ও সময়ের অভাবে তা আর হয়ে ওঠে না।
ঢাকার মতো জনবহুল শহরে অসংখ্য বেতনভোগী মানুষ আজ এই একই বাস্তবতার মুখোমুখি। খরচ বৃদ্ধির কারণে সঞ্চয় তো দূরের কথা, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক ও পরিসংখ্যান একনজরে
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির চিত্র বুঝতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে আসা তথ্যগুলো নিচে টেবিলে উপস্থাপন করা হলো:
| অর্থনৈতিক সূচক ও পরিসংখ্যানের বিবরণ | নির্ধারিত হার বা পরিমাণ |
| সার্বিক মূল্যস্ফীতি (সেপ্টেম্বর ২০২৬) | ৮.৩৪ শতাংশ |
| সার্বিক মূল্যস্ফীতি (আগস্ট ২০২৬) | ৮.২৬ শতাংশ |
| খাদ্য মূল্যস্ফীতি (সেপ্টেম্বর ২০২৬) | ৭.২২ শতাংশ |
| খাদ্য মূল্যস্ফীতি (পূর্ববর্তী মাস) | ৭.০২ শতাংশ |
| খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি (সেপ্টেম্বর ২০২৬) | ৯.৩০ শতাংশ |
| খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি (পূর্ববর্তী মাস) | ৯.৩২ শতাংশ |
| গড় মূল্যস্ফীতি (১২ মাস, সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত) | ৮.৬৫ শতাংশ |
| গড় মূল্যস্ফীতি (তার আগের ১২ মাস) | ৯.inputFields. ৪৬ শতাংশ |
| জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার (সেপ্টেম্বর ২০২৬) | ৭.৯০ শতাংশ |
| উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারের হার | ২৯.০০ শতাংশ |
| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে শ্রম চাহিদার ওপর সম্ভাব্য চাপ | ২.০০ শতাংশ |
| মোটরসাইকেল চালকের দৈনিক জ্বালানি খরচ | ২০০ টাকা |
| মেট্রোলের দৈনিক যাতায়াত খরচ | ২৪০ টাকা |
মূল্যস্ফীতি ও মজুরির অসম ব্যবধান
মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমার অর্থ এই নয় যে পণ্যের দাম কমে গেছে। এর সহজ অর্থ হলো আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে, যার ফলে পরিবারগুলোকে আগের চেয়ে চড়া দামেই পণ্য কিনতে হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক মডেলিং নেটওয়ার্কের গবেষণা পরিচালক মাহতাব উদ্দিনের মতে, দেশের মুদ্রানীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণেই মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যুক্তরাজ্য বা ভারতের মতো দেশগুলো সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও বাংলাদেশ সঠিক সময়ে ও কঠোরভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এর সঙ্গে দুর্বল কর আদায় ব্যবস্থা এবং বড় প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
পণ্যের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাধারণ মানুষের মজুরি বাড়েনি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে মাছ, মাংস বা পুষ্টিকর খাবারের তালিকা ছোট করছেন এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন।
ঋণের দুষ্টচক্র ও তরুণ প্রজন্মের সংকট
এই আর্থিক চাপ শুধু চাকরিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং পড়ালেখা শেষ করে চাকরির সন্ধানে থাকা তরুণ ও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন চলাফেরাকেও কঠিন করে তুলেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, যাতায়াত বাবদ প্রতিদিন তার উল্লেখযোগ্য অংকের অর্থ ব্যয় হয়। মাস শেষে হাত খালি হয়ে যাওয়ায় বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে চলতে হয় তাকে। পরবর্তীতে হাতেনাতে বেতন পেলেও সেই ধার শোধ করতে গিয়ে আবার নতুন করে সংকটে পড়তে হয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ বেকারত্ব এবং চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এর ওপর প্রযুক্তির পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শ্রম বাজারের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
বাজেট তৈরি ও অর্থ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব
দৈনন্দিন খরচের সঠিক হিসাব রাখার অভ্যাস কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। সাংবাদিক মুমিতুল মিম্মার মতে, প্রতিদিনের ছোট থেকে বড় খরচের হিসাব ডায়েরিতে টুকে রাখার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করা সহজ হয়। তবে মৌলিক চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত আয় না থাকলে কেবল বাজেট দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়। আয়ের পরিধি বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর কার্যকর উপায় খুঁজে বের করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।








