রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় তিন মাস ধরে লাইনের গ্যাস না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। মোহাম্মদিয়া হাউজিং, নবোদয় হাউজিং, আদাবর ও ঢাকা উদ্যানসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। রান্নার জন্য বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছেন স্থানীয়রা। এতে বেড়েছে পারিবারিক ব্যয়, তৈরি হয়েছে নানা ধরনের দুর্ভোগ।
বাসিন্দাদের অনেকেই গ্যাসের বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করছেন। তবে নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের জন্য নিয়মিত সিলিন্ডার কেনা কিংবা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করা বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। ফলে অনেক পরিবারকে লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় ক্ষোভও বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাস না থাকলেও নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ, যে সেবা স্বাভাবিকভাবে পাওয়ার কথা, সেটি না পেয়েও বিল দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। এর পাশাপাশি রান্নার জন্য বিকল্প জ্বালানি কিনতে গিয়ে বাড়তি অর্থ খরচ হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সমস্যাটি কেবল গ্যাসের সামগ্রিক সংকটের কারণে তৈরি হয়েছে—এমনটি তারা মনে করেন না। গ্যাসের পাইপলাইনে লিকেজ, পানি জমে থাকা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির মতো বিষয়ও সংকটকে আরও তীব্র করেছে বলে তাদের অভিযোগ। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে একই পরিস্থিতি চললেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাড়ির মালিকরাও সমস্যায় পড়েছেন। অনেক বাড়িতে গ্যাসের স্বাভাবিক ব্যবস্থা না থাকায় নতুন ভাড়াটিয়া বাসা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন কয়েকজন বাড়ির মালিক। ফলে রান্নার জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে আবাসন ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
নবোদয় হাউজিং সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্যাস লাইনের ভেতরে পানি রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, লাইনে পানি জমে থাকলে সেটি পরিষ্কার করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু সমস্যা সমাধানে তিতাসের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
শফিকুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। বাসিন্দারা দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন।
তবে গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে তিতাস কর্তৃপক্ষ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। তিতাসের সোবহানবাগ অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক নজিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতির কারণে চাপ কম রয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বলেই স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে স্থানীয়দের অভিযোগের জায়গায় পার্থক্য থাকলেও ভোগান্তির বাস্তবতা নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে কোনো সংশয় নেই। প্রায় তিন মাস ধরে রান্নার মতো প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাজে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের।
এই সংকটের প্রভাব শুধু আবাসিক এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে কল-কারখানা ও পরিবহণ খাতেও সমস্যার কথা উঠে এসেছে। জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন হলে এর প্রভাব দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পাশাপাশি বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়তে পারে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দাদের এখন প্রধান দাবি, গ্যাস সংকটের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। পাইপলাইনে কোনো কারিগরি সমস্যা থাকলে তা মেরামত এবং সরবরাহ ঘাটতি থাকলে সেটি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন গ্যাস না পেয়েও বিল পরিশোধের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিবেচনায় নেওয়ার দাবি উঠেছে।
তিন মাস ধরে চলা এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের প্রত্যাশা একটাই—সাময়িক আশ্বাস নয়, সমস্যার স্থায়ী সমাধান। নিয়মিত লাইনের গ্যাস সরবরাহ ফিরিয়ে এনে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ চান মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা।









