ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষে গড়িয়েছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন এলাকায় মাস্টারদা সূর্যসেন হল ও সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ছাত্রদল নেতাকর্মী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। আহতদের মধ্যে রয়েছেন সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রমজান আলী, সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাহরিয়ার লিওন, হল শাখার সদস্য সাইফ আলী শিথিল এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজ সৌরভ।
সংঘর্ষের সময় সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী রমজান আলী একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়। অন্য আহতদেরও জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
যেভাবে বিরোধের সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৫ অক্টোবর বিকেলে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী মাহফুজ সৌরভ মোটরসাইকেল চালানোর সময় সূর্যসেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আরিফুল ইসলাম তারেকের কাছাকাছি চলে যান। বিষয়টি নিয়ে তারেক প্রতিবাদ করলে দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সৌরভ তাকে কয়েক দফা চড় মারেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর পরদিন মঙ্গলবার তারেক ও তার কয়েকজন বন্ধু সৌরভকে রাস্তায় থামিয়ে ওই ঘটনার বিষয়ে জানতে চান। পরিস্থিতি দেখে সৌরভ মোটরসাইকেলটি ফেলে সেখান থেকে চলে যান। পরে সূর্যসেন হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে নিজেদের হলে নিয়ে যান।
মোটরসাইকেলটি ফেরত দেওয়া এবং আগের বিরোধ মিটিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বৈঠকে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাহরিয়ার লিওনসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আলোচনা চলার একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও মারামারি শুরু হয়।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী ফাইম শাহরিয়ার সাজিবের অভিযোগ, বিরোধ মীমাংসার কথা বলে জহুরুল হক হলের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সেখানে আসেন এবং তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। তার দাবি, বৈঠকের পরিবেশ একপর্যায়ে পুরোপুরি বদলে যায় এবং হামলার কারণে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাহরিয়ার লিওন। তার দাবি, মাহফুজ সৌরভ নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়ার পরপরই সূর্যসেন হলের লোকজন তাদের ওপর আকস্মিকভাবে হামলা চালায়। ফলে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয় বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, মাহফুজ সৌরভের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তার মোটরসাইকেল আটকে রেখে সেটি ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। এ বিষয়ে ৫ অক্টোবরের ঘটনার বিষয়ে জানতে সৌরভের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ফলে সংঘর্ষের আগে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের ওপর প্রথম হামলার অভিযোগ করেছে।
প্রশাসনের অবস্থান
ঘটনার পর বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তবে তিনি সংঘর্ষের বিষয়ে অবগত হয়েছেন এবং এ ঘটনায় থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছেন।
মোটরসাইকেলকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ব্যক্তিগত বিরোধ কীভাবে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিল, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এমন বিরোধ যাতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত না করে, সে বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ না আসায় ঘটনার দায় ও প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আনুষ্ঠানিকভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।









