চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় বসতভিটার জমি নিয়ে বিরোধের এক পৈশাচিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সীমানা নিয়ে বিবাদের জেরে তিন বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে আছাড় দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশী ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাপাহাড় গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। নিহত শিশুর নাম নূর আবদুল্লাহ, যে নুরুল আলম রাসেলের সন্তান। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে পুরো এলাকায় শোকের স্তব্ধতা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
Table of Contents
বিরোধের ইতিহাস ও আদালতের নিষেধাজ্ঞা
নিহত শিশুর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবেশী দ্বীন ইসলামের পরিবারের সঙ্গে নুরুল আলমের পরিবারের প্রায় দেড় যুগ ধরে জমির মালিকানা ও ঘর নির্মাণ নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। এই দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ নিরসনে ইতিপূর্বে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তা বিফলে যায়। পরবর্তীতে বিষয়টি আইনি লড়াইয়ে গড়ায় এবং নুরুল আলমের পরিবার আদালতের দ্বারস্থ হন। বিজ্ঞ আদালত ওই বিরোধপূর্ণ জমিতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
নির্মম সেই মুহূর্তের বিবরণ
নিহত শিশুর স্বজনদের দাবি, বুধবার বেলা ১১টার দিকে দ্বীন ইসলাম ও তার ভাই আরিফুল ইসলাম আদালতের আদেশ অমান্য করে ওই জমিতে ঘর তোলার কাজ শুরু করেন। নুরুল আলমের মা ও স্ত্রী এতে বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রতিপক্ষ উত্তেজিত হয়ে নুরুল আলমের স্ত্রী রূপা আক্তারকে মারধর করে। তখন পাশে থাকা তিন বছরের অবুঝ শিশু আবদুল্লাহকে ঘাতক দ্বীন ইসলাম জাপটে ধরে সজোরে মাটিতে আছাড় দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারণি:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহত শিশু | নূর আবদুল্লাহ (৩ বছর)। |
| ঘটনাস্থল | দক্ষিণ সোনাপাহাড়, জোরারগঞ্জ, মিরসরাই। |
| বিরোধের প্রেক্ষাপট | প্রায় ১৫ বছর ধরে চলা জমির মালিকানা ও সীমানা বিবাদ। |
| আইনি অবস্থান | বিরোধপূর্ণ স্থানে আদালতের স্থিতাবস্থা বা নিষেধাজ্ঞা ছিল। |
| প্রধান অভিযুক্ত | প্রতিবেশী দ্বীন ইসলাম ও আরিফুল ইসলাম। |
| বর্তমান অবস্থা | ৩ জন আটক, প্রধান দুই অভিযুক্ত পলাতক। |
শোকে কাতর পরিবার ও বিচার প্রার্থনা
শিশু আবদুল্লাহর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালের মর্গের সামনে নিহত শিশুর বাবা ও স্বজনদের আর্তনাদে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিহতের দাদি জ্যোৎস্না আরা বেগম অভিযোগ করেন, “নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও তারা গায়ের জোরে ঘর তুলছিল। বাধা দিতে গেলে আমার নাতনিকে তারা পশুর মতো আছাড় দিয়ে মেরে ফেলল।” পুরো পরিবার এখন ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও পুলিশের পদক্ষেপ
জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী নাজমুল হক জানান, ঘটনার পর পরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এ পর্যন্ত তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তবে প্রধান দুই অভিযুক্ত ঘটনার পর থেকেই পলাতক থাকায় তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ওসি আরও জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রক্রিয়া চলছে এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
উপসংহার
জমির জন্য একটি নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে যাওয়ার এই ঘটনা আমাদের সামাজিক সংহতি ও সহনশীলতার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে এমন জঘন্য অপরাধ আইনের শাসনের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ব্যবস্থা করা হবে।
