ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সহিংসতার মাত্রা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ৫০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। রোববার (১১ জানুয়ারি) সংস্থাটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। নিহতদের মধ্যে বিক্ষোভকারী যেমন রয়েছেন, তেমনি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এইচআরএএনএর তথ্যমতে, ইরানের ভেতরে ও বাইরে থাকা তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কের কর্মী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, গত দুই সপ্তাহে অন্তত ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৪৮ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া দেশজুড়ে ১০ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, নারী অধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
এই হতাহতের তথ্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হলে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিক বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হলে যুক্তরাষ্ট্র নীরব থাকবে না। অন্যদিকে, তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে—যেকোনো ধরনের বিদেশি সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের জবাব কঠোরভাবে দেওয়া হবে।
২০২২ সালের পর এটিই ইরানে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুরুতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর এই আন্দোলন শুরু হলেও খুব দ্রুত তা রাজনৈতিক দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত আকার ধারণ করে। বিক্ষোভকারীরা সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং নাগরিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন। অপরদিকে, ইরান সরকার অভিযোগ করছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই বিক্ষোভে উসকানি ও সমর্থন দিচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ইন্টারনেট সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত। গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরান সরকার প্রায় সব ধরনের ইন্টারনেট যোগাযোগ সীমিত বা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে দেশটির ভেতরের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এই কারণে হতাহতের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারছে না।
নিচের সারণিতে এইচআরএএনএর প্রকাশিত তথ্যের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| বিবরণ | সংখ্যা |
|---|---|
| নিহত বিক্ষোভকারী | ৪৯০ জন |
| নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য | ৪৮ জন |
| মোট নিহত | ৫৩৮ জন (প্রায়) |
| গ্রেফতারকৃত | ১০,৬০০+ জন |
| বিক্ষোভ শুরুর তারিখ | ২৮ ডিসেম্বর |
সামগ্রিকভাবে, ইরানের এই বিক্ষোভ শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
