জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

মাধবপুরে কিশোরী ধর্ষণ: বিচার মেলেনি থানায়, সালিশে ৯০ হাজার টাকায় রফাদফা

হবিগঞ্জের মাধবপুরে এক কিশোরীকে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার আদালত কিংবা থানায় না গিয়ে আটকে গেছে স্থানীয় বিচার-সালিশের টেবিলে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে প্রভাবশালীদের মধ্যস্থতায় অভিযুক্তকে মাত্র ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করে পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তার ওপর নির্ধারণ করা সেই অর্থেরও সিংহভাগ এখনো পৌঁছায়নি ভুক্তভোগী পরিবারের হাতে; তারা পেয়েছে মাত্র ২০ হাজার টাকা। দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এমন ফৌজদারি অপরাধ অর্থের বিনিময়ে রফাদফা করার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও আইনজীবীরা।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, মাধবপুর উপজেলার বাসিন্দা রাজা মিয়ার ছেলে হানিফ মিয়া সম্প্রতি ওই এলাকায় তাঁর শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসেন। গত ২০ আগস্ট দুপুরে ভুক্তভোগী কিশোরীর বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে ঘরে ঢোকেন হানিফ এবং তাঁকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। কিশোরীর আকস্মিক চিৎকারে তাঁর মা দ্রুত সেখানে ছুটে এলে অভিযুক্ত হানিফ সেখান থেকে পালিয়ে যান। পরে স্বজনেরা রক্তাক্ত ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় কিশোরীকে উদ্ধার করে দ্রুত হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।

হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ভুক্তভোগী পরিবার যখন থানায় গিয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাদের চরম দারিদ্র্য ও স্থানীয় একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি। আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা আর খরচের ভয় দেখিয়ে পরিবারটিকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়। পরবর্তীতে গত বুধবার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আবেদুর রহমান আবেদের মধ্যস্থতায় এ নিয়ে এক সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

এলাকাবাসীর বরাতে জানা যায়, বিচার-সালিশে শুধু স্থানীয় মাতব্বররাই নন, উপস্থিত ছিলেন পাশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের এক সাবেক চেয়ারম্যানসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণ একটি নন-কম্পাউন্ডেবল বা অ-আপসযোগ্য এবং জামিনঅযোগ্য অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও, সালিশের বৈঠকে অভিযুক্তকে মাত্র ৯০ হাজার টাকা জরিমানার বিনিময়ে পুরোপুরি মুক্ত ঘোষণা করা হয়।

আইনের কাছে না গিয়ে কেন সালিশে গেলেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে ভুক্তভোগী কিশোরীর মা নিজের ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “আমরা দিনআনা দিন খাওয়া অত্যন্ত গরিব মানুষ। কোর্ট-কাচারি আর মামলার পেছনে ছোটার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। মেম্বার আবেদুর রহমান যখন আইনি ঝামেলা ছাড়া সমাধানের আশ্বাস দিলেন, তখন আমরা বাধ্য হয়েই রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু সেখানেও তো আমাদের ঠকানো হলো। ৯০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হলেও আমাদের হাতে দেওয়া হয়েছে মাত্র ২০ হাজার টাকা।”

ধর্ষণ মামলায় মধ্যস্থতা করার কথা স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ইউপি সদস্য আবেদুর রহমান আবেদ নিজেই। তিনি জানান, এলাকার বহু গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতেই সালিশে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। জরিমানার বাকি ৭০ হাজার টাকা পরিশোধের জন্য অভিযুক্ত পক্ষকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত তারিখেই সেই টাকা পরিশোধ করা হবে বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে কোনো ফৌজদারি অপরাধের বিচার আদালতের বাইরে সালিশ ডেকে মীমাংসা করাকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ বলে উল্লেখ করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী মোজাম্মেল হক রাসেল বলেন, “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) অনুযায়ী ধর্ষণের অভিযোগ কোনো অবস্থাতেই আপসযোগ্য নয়। অর্থের বিনিময়ে এ ধরনের অপরাধের রফাদফা করা আইনত অপরাধ। বিচার প্রক্রিয়াকে এভাবে বাধাগ্রস্ত করা বা অভিযুক্তকে আড়াল করার চেষ্টা চালানোদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

বিষয়টি সম্পর্কে মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল রানা জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত থানায় গিয়ে কোনো লিখিত এজাহার জমা দেওয়া হয়নি। তবে স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে ঘটনাটি অর্থ দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার একটি খবর তাঁদের কানে এসেছে। খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তের পাশাপাশি বেআইনি সালিশকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।

Tags :

মোঃ সাকিব হোসেন | উপ-সম্পাদক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর