একটি আধুনিক আইফোন কেনার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যে একজন মানুষকে নিজের রক্ত-মাংসের সন্তানের প্রতি কতটা নির্মম করে তুলতে পারে, পটুয়াখালীর দশমিনায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি তারই এক বাস্তব উদাহরণ। উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের মাছুয়াখালী গ্রামে মাত্র এক লাখ টাকার বিনিময়ে দেড় বছরের শিশুপুত্রকে বিক্রি করে দিয়েছেন কাঠমিস্ত্রি বাবা। শনিবার সকালে সংঘটিত এই অমানবিক ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ পুরো অঞ্চলে চরম চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মাছুয়াখালী গ্রামের মফিজ মুন্সির ছেলে অভিযুক্ত মো. মারুফ মুন্সি পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। চার বছর আগে ঢাকার সাভারের তরুণী বৃষ্টি বেগমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের কোলজুড়ে আসে শিশুপুত্র মুসা। কিন্তু সাম্প্রতিক পারিবারিক কলহের জেরে এক মাস আগে স্ত্রী সন্তানকে না নিয়েই বাপের বাড়ি চলে যান। এর কিছুদিন পর মারুফ ঢাকায় যান এবং গত শুক্রবার সন্ধ্যায় গ্রামে ফেরেন।
গ্রাম থেকে ফিরেই শনিবার সকালে মারুফ নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নামেন। তিনি তাঁর মা মাহফুজা বেগমের কাছ থেকে ছেলেকে বাজারে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে সঙ্গে নিয়ে বের হন। দাদি মাহফুজা বেগম সরল বিশ্বাসে নাতিকে গোসল করিয়ে সাজিয়ে ছেলের হাতে তুলে দেন। তবে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও ছেলে ও নাতি কেউ না ফেরায় পরিবারের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। আত্মীয়দের বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করে কোনো সন্ধান মেলেনি।
পরে জানা যায়, বাজারে যাওয়ার কথা বলে মারুফ সোজা চলে যান পার্শ্ববর্তী আলীপুর ইউনিয়নের রমানাথসেন গ্রামে। সেখানে ইমরান হোসেন নামের এক ব্যক্তির কাছে এক লাখ টাকায় চুক্তি করে লিখিতভাবে নিজের অবুজ সন্তানকে তুলে দেন তিনি। সন্তান বিক্রির টাকা হাতে পাওয়ামাত্রই তিনি সাভারের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং সেই টাকা দিয়ে নিজের পুরোনো মোবাইল ফোন বদলে একটি নতুন মডেলের আইফোন কিনে নেন। মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি নিজেই ফোন কেনার উদ্দেশ্যে এই কাজ করার কথা স্বীকার করেছেন।
শিশুটিকে গ্রহণকারী ইমরান হোসেন ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করে জানান, তাঁর শাশুড়ির কোনো ছেলেসন্তান না থাকায় মারুফ বেশ কিছুদিন ধরে সন্তানটিকে দত্তক দেওয়ার জন্য তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। অবশেষে লিখিত স্ট্যাম্পের মাধ্যমে এক লাখ টাকা দিয়ে শিশু মুসাকে গ্রহণ করা হয় এবং ওই দিন বিকেলেই শিশুটিকে তাঁর শ্বশুরের জিম্মায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর থেকে চরম মর্মাহত শিশুটির দাদি মাহফুজা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, আইফোনের মতো একটি বস্তুর জন্য বাবা নিজের সন্তানকে এভাবে বিক্রি করে দিতে পারে তা তাঁদের কল্পনার বাইরে ছিল। তিনি শুধু তাঁর ফুটফুটে নাতিকে ফেরত পেতে চান এবং অভিযুক্ত ছেলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
ঘটনাটি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নজরে আসার সাথে সাথেই আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম জানান, বিষয়টি জানার পরেই পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। শিশুটিকে যাঁর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল সেই ইমরান হোসেনকে ইতোমধ্যে থানা হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করছে এবং শিশুটিকে নিরাপদে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পলাতক বাবা মারুফকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।









