খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জানুয়ারি ২০২৬, ২:৪৮ এএম

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং নিম্নআয়ের মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৬’ জারি করেছে। বুধবার আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’ নামক একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপিত হলো। এর ফলে এখন থেকে ক্ষুদ্রঋণ দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ঋণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তারা সাধারণ ব্যাংকের মতো আমানত সংগ্রহ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থেকে পরিচালিত হতে পারবে।
Table of Contents
এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, নতুন এই ব্যাংকগুলো মূলত ‘সামাজিক ব্যবসা’ (Social Business) মডেলে পরিচালিত হবে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রবর্তিত এই মডেলে বিনিয়োগকারীরা কেবল তাদের মূল বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাবেন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কোনো মুনাফা বা লভ্যাংশ গ্রহণ করবেন না। অর্জিত অতিরিক্ত মুনাফা প্রতিষ্ঠানের রিজার্ভ ফান্ডে জমা হবে এবং তা পুনরায় সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হবে।
নিচে মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংকের গঠন ও আর্থিক কাঠামোর মূল দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
সারণি: মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক ২০২৬-এর প্রধান আর্থিক ও প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
| বিষয়বস্তু | নির্ধারিত শর্ত ও বৈশিষ্ট্য |
| অনুমোদিত মূলধন | ৫০০ কোটি টাকা (প্রতি শেয়ার ১০০ টাকা মূল্যের ৫ কোটি শেয়ার) |
| পরিশোধিত মূলধন | সর্বনিম্ন ২০০ কোটি টাকা |
| শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো | ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ন্যূনতম ৬০% অংশীদারিত্ব সংরক্ষিত |
| বোর্ড গঠন | ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মোট ১০ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ |
| পরিচালক বিভাজন | ৪ জন ঋণগ্রহীতা প্রতিনিধি, ৩ জন সাধারণ শেয়ারহোল্ডার ও ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক |
| তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা | সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক (সমন্বয়ে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ) |
এতদিন ক্ষুদ্রঋণ দানকারী এনজিওগুলো কেবল তাদের নিজস্ব সদস্যদের কাছ থেকেই সঞ্চয় সংগ্রহ করতে পারত। কিন্তু নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, লাইসেন্সপ্রাপ্ত মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংকগুলো যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করতে পারবে। এতে করে প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিলের সংকট দূর হবে এবং তারা কম সুদে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা অর্জন করবে। এছাড়া, ক্ষুদ্র উদ্যোগে বিনিয়োগের পরিধি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২৫ জন কর্মচারী এবং ১.৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে ‘ক্ষুদ্র উদ্যোগ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশে অত্যন্ত কঠোর ও মানবিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনোভাবেই গ্রাহককে হয়রানি, অপমান বা বলপ্রয়োগ করা যাবে না। ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়াগুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. ১৫ দিনের নোটিশ: ঋণ আদায় কার্যক্রম শুরুর আগে অবশ্যই গ্রাহককে ১৫ দিনের লিখিত নোটিশ প্রদান করতে হবে।
২. পুনঃতফসিলিকরণ: খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রথমে ঋণ পুনঃতফসিল (Reschedule) বা পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে হবে।
৩. বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি: আইনি লড়াইয়ের আগে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (ADR) মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে।
৪. মানবাধিকার সংরক্ষণ: আদায়ে কোনো প্রকার জবরদস্তি বা মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণকারী আচরণ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নতুন এই আইনের ফলে বীমা সদৃশ সেবা এবং বড় আকারের মূলধন গঠনের সুযোগ তৈরি হলেও ছোট ছোট এনজিওগুলোর মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকির কারণে অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে একীভূত (Consolidation) হতে বাধ্য হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্ষুদ্রঋণ খাতে স্বচ্ছতা আনবে এবং নিম্নআয়ের মানুষকে মূলধারার ব্যাংকিং সেবায় অন্তর্ভুক্ত করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
মন্তব্য