খুলনার ভৈরব নদের জেলখানা ঘাট এলাকায় ফেরির সঙ্গে সংঘর্ষে যাত্রীবাহী একটি ট্রলার ডুবে গেছে। মঙ্গলবার রাতে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় ট্রলারে থাকা ৩০ থেকে ৪০ জন যাত্রীর অধিকাংশই উদ্ধার হয়ে তীরে ফিরেছেন। তবে রাকিব খান (২৭) নামের এক যুবকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। বুধবার সকাল পর্যন্ত তাঁকে উদ্ধারে নদীতে তল্লাশি চলছিল।
মঙ্গলবার রাত পৌনে ১০টার দিকে জেলখানা ঘাট ও সেনেরবাজার ঘাটের মাঝামাঝি ভৈরব নদে দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিখোঁজ রাকিব সেনেরবাজার এলাকার বাসিন্দা। তিনি পেশায় রূপসজ্জাশিল্পী।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, জেলখানা ঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলার সেনেরবাজার ঘাটের দিকে যাচ্ছিল। একই সময়ে সেনেরবাজার দিক থেকে খুলনার দিকে আসছিল একটি ফেরি। মাঝনদীতে ফেরিটির সঙ্গে ট্রলারটির সংঘর্ষ হয়। ধাক্কার পর ট্রলারটি দ্রুত পানিতে ডুবে যায়। সংঘর্ষের পর ফেরিটি থামিয়ে দেওয়া হয়।
দুর্ঘটনার শব্দ ও চিৎকার শুনে আশপাশের নৌযান এবং স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। নদীতে পড়ে যাওয়া যাত্রীদের কেউ সাঁতরে তীরে ওঠেন, আবার কয়েকজনকে আশপাশের নৌযানের সহায়তায় উদ্ধার করা হয়। পরে কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতায় যোগ দেন।
খুলনা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক মাসুদ সরদার জানান, দুর্ঘটনার পর নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় ডুবে যাওয়া ট্রলারটি দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কেউ নিখোঁজ আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে নৌ পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা নদীতে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাকিবের পরিবার বলছে, দুর্ঘটনার সময় তিনি ওই ট্রলারে ছিলেন কি না, সেটি তাঁরা সরাসরি দেখেননি। তবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় ও দুর্ঘটনার সময়ের মিল থাকায় স্বজনেরা আশঙ্কা করছেন, তিনি নদীতে পড়ে নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারেন।
রাকিবের মা রোকসেনা বেগম জানান, মঙ্গলবার মাগরিবের সময় সেনেরবাজারের বাড়ি থেকে রাকিব খুলনা নগরে যান। রাতে তিনি নগরের মডার্ন মোড়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছিলেন। পরে বন্ধুরা তাঁকে কমার্স কলেজ মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যান। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাকিবের বন্ধুরা রাতেই খুলনার বিভিন্ন বড় হাসপাতালে গিয়ে তাঁর সন্ধান করেন। কিন্তু বুধবার সকাল পর্যন্ত কোনো হাসপাতালে তাঁর সন্ধান মেলেনি।
রূপসা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল খায়ের জানান, গভীর রাতে একজন নিখোঁজ থাকার খবর তাঁরা পান। এরপর থেকেই তাঁকে উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে। ঘটনাস্থলে কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের সদস্যরা কাজ করছেন। উদ্ধার তৎপরতায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদেরও যুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার পর জেলখানা ঘাটের নৌযান চলাচল ও যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, ঘাটটিতে যাত্রী ওঠানামার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত শৃঙ্খলা নেই। অনেক সময় ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি যাত্রী নিয়ে ট্রলার চলাচল করে। এতে নদীপথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে বলে তাঁদের দাবি।
তবে ট্রলারটিতে দুর্ঘটনার সময় ঠিক কতজন যাত্রী ছিলেন, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া ৩০ থেকে ৪০ জনের হিসাবও আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা হয়নি। একইভাবে সংঘর্ষের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং নৌযান দুটির চলাচলসংক্রান্ত পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে।
ভৈরব নদ খুলনা নগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। বিভিন্ন ঘাটে প্রতিদিন স্থানীয় যাত্রী ও নৌযান চলাচল করে। ফলে যাত্রী ওঠানামায় শৃঙ্খলা, নৌযানের নিরাপদ চলাচল এবং ধারণক্ষমতার বাইরে যাত্রী পরিবহন না করার বিষয়টি দুর্ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ। জেলখানা ঘাটের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর এসব বিষয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগও নতুন করে সামনে এসেছে।
বুধবার সকাল পর্যন্ত রাকিবের সন্ধান না মেলায় তাঁর পরিবার উৎকণ্ঠায় রয়েছে। নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে উদ্ধারকাজে বাধা তৈরি হলেও নিখোঁজ যুবককে খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছিল।










