ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে নিখোঁজের ছয় দিন পর তিতাস নদ থেকে মুকবুল হোসেন (৪০) নামের এক বালু ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পানির তলদেশে ডুবে থাকা একটি কাঠের নৌকার নিচের অংশের সঙ্গে রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশের ধারণা, তাঁকে নৌকার সঙ্গে বেঁধে সেটি পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
রোববার দুপুরে উপজেলার মিরপুর এলাকায় তিতাস নদে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের ডুবুরি দল। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
মুকবুল উপজেলার ছলিমাবাদ ইউনিয়নের পাঠামারা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মৃত মন মিয়া ব্যাপারীর ছেলে। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তিতাস নদে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত একটি ড্রেজার ব্যবসার অংশীদার ছিলেন তিনি।
নিখোঁজ হওয়ার পর জিডি
পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাত ১০টার পর ড্রেজার থেকে নিখোঁজ হন মুকবুল। এরপর তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন নদ ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্নভাবে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান পাননি।
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বৃহস্পতিবার মুকবুলের চাচাতো ভাই শফিকুল ইসলাম বাঞ্ছারামপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
তবে একই সময়ে আরও একটি নিখোঁজের ঘটনায় বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে। মুকবুল নিখোঁজ হওয়ার দিন একই এলাকা থেকে ড্রেজার ব্যবসার আরেক অংশীদার রুবেল মিয়াও নিখোঁজ হন। একই জায়গা থেকে দুজনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
জীবিত উদ্ধার রুবেল
শনিবার রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট পশ্চিমে রুবেলকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। প্রথমে তাঁকে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে পুলিশি পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মুকবুলের বড় ভাই বাবুল মিয়া বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকেই তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। পরিবারের লোকজন খোঁজ শুরু করার পরও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় থানায় জিডি করা হয়।
বাবুলের ভাষ্য, মুকবুল নিখোঁজ হওয়ার আগে রুবেল একাধিকবার তাঁদের জানিয়েছিলেন যে মুকবুল ঢাকায় গেছেন। জিডি করার পর বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর রুবেলও নিখোঁজ হন। পরে শনিবার রাতে ড্রেজারের পাশের একটি বাড়িতে তিনি ফিরে আসেন।
মুকবুলের পরিবারের পক্ষ থেকে রুবেলের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। রুবেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তাঁর বক্তব্যও নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার অভিযানে মরদেহ উদ্ধার
মুকবুলের সন্ধান না পাওয়ায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে খবর দেওয়া হয়। রোববার সকাল আটটার দিকে নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের ডুবুরি দল তিতাস নদে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের লিডার মোহাম্মদ হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে ডুবুরি আশিক মাহমুদ ও দেলোয়ার হোসাইন অভিযানে অংশ নেন। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পানির তলদেশে তল্লাশির পর বেলা দেড়টার দিকে ডুবুরিরা মুকবুলের মরদেহের সন্ধান পান।
হারুনুর রশিদ জানান, পানির নিচে ডুবে থাকা একটি নৌকার নিচের অংশের লোহার অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় মরদেহটি পাওয়া যায়। পরে সেটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।
তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে নৌকা ও রুবেলের অবস্থান
বাঞ্ছারামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াছিন জানান, প্রাথমিকভাবে তাঁদের ধারণা, মুকবুলকে প্রথমে কাঠের নৌকার সঙ্গে বাঁধা হয়েছিল। এরপর পাথরের সঙ্গে বেঁধে নৌকাটি পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ ফুট পশ্চিমে রুবেলকে জীবিত উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে চিকিৎসাধীন থাকায় এখনো তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেনি পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, রুবেল সুস্থ হলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাঁর বক্তব্য, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থলের অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনার পর মুকবুলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা আরও স্পষ্ট হবে।









