ভারতের দিল্লিতে রাস্তার নির্মাণকাজের মান পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে এক তরুণকে চড় মারার অভিযোগ উঠেছে দিল্লির লোকনির্মাণ দপ্তরের (পিডব্লিউডি) মন্ত্রী পারভেশ সাহিব সিং ভার্মার বিরুদ্ধে। পশ্চিম দিল্লির তিলক নগরে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ঘটনাটি ঘটে। পরে ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে বিজেপি ও আম আদমি পার্টির (এএপি) মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়।
ঘটনার শুরু রাস্তার নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে কেন্দ্র করে। তিলক নগর এলাকায় একটি রাস্তার কাজ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন পারভেশ ভার্মা। সেখানে স্থানীয় এএপি বিধায়ক জারনাইল সিংও উপস্থিত ছিলেন। রাস্তার কাজের মান নিয়ে তিনি আপত্তি তোলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জারনাইল সিং রাস্তার ওপরের অংশের কিছুটা হাত দিয়ে তুলে দেখিয়ে নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন করেন। এ নিয়ে মন্ত্রী ও বিধায়কের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।
পরিদর্শনের সময় ঘটনাটি ভিডিও করছিলেন সাহিব সিং নামে এক তরুণ। তিনি জারনাইল সিংয়ের সহযোগী এবং বিধায়কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে। সাহিবের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি সরাসরি সম্প্রচার করছিলেন। পরে তার হাতে থাকা মোবাইল ফোন সরিয়ে দিয়ে পারভেশ ভার্মা তাকে চড় মারেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পারভেশ ভার্মা তরুণটির হাতে থাকা মোবাইল ফোন নিচের দিকে সরিয়ে দেন। এরপর তাকে মুখে চড় মারতে দেখা যায়। ঘটনার পর ওই তরুণও মন্ত্রীর দিকে এগিয়ে যান এবং হাত তুলতে দেখা যায়। দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে একজন নিরাপত্তাকর্মী মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাদের আলাদা করার চেষ্টা করেন। আশপাশে থাকা লোকজনও তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। ভিডিওটির যে অংশ প্রকাশ্যে এসেছে, সেখানে ঘটনার আগের পুরো কথোপকথন বা পরিস্থিতির সবটুকু দেখা যায় না।
ঘটনার পর সাহিব সিং দিল্লি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন। পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিকাশপুরী থানায় তার অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং ঘটনার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। সাহিবের দাবি, তিনি মন্ত্রীকে উসকানি দেননি; বরং রাস্তা পরিদর্শনের ঘটনাটি ভিডিও করছিলেন। তার বক্তব্য, লাইভ সম্প্রচার বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই তার মোবাইল সরিয়ে নিয়ে তাকে চড় মারা হয়।
তবে পারভেশ ভার্মার বক্তব্য আলাদা। তিনি দাবি করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ঘটনার পুরো প্রেক্ষাপট নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে এএপি-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে তিনি প্রতিক্রিয়া দেখান বলে জানান মন্ত্রী। পরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, যা ঘটেছে, তা হওয়া উচিত ছিল না।
এদিকে সাহিব সিংয়ের আগের একটি মামলার তথ্যও সামনে এসেছে। দিল্লি পুলিশের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে আগে দিল্লি পৌর সংস্থার (এমসিডি) এক কর্মীকে মারধরের অভিযোগে মামলা হয়েছিল এবং ওই ঘটনায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি জামিনে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই পুরোনো মামলার সঙ্গে তিলক নগরের বর্তমান ঘটনার কোনো সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা পুলিশ তদন্তের বিষয়।
রাস্তার নির্মাণমান নিয়েও প্রশ্নটি এখন আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। জারনাইল সিংয়ের অভিযোগের পর পারভেশ ভার্মা রাস্তার কাজের মান যাচাইয়ের কথা জানিয়েছেন। প্রয়োজনে রাস্তার নমুনা নিয়ে কোর-কাটিং পরীক্ষার মাধ্যমে নির্মাণের মান পরীক্ষা করা হতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন। ফলে বিতর্কের একটি অংশ এখন শারীরিক সংঘাতের অভিযোগ, আরেকটি অংশ সংশ্লিষ্ট রাস্তার নির্মাণকাজের মান নিয়ে।
ঘটনার পর এএপি নেতারা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। দলটির পক্ষ থেকে তিলক নগরে প্রতিবাদ কর্মসূচিও করা হয় এবং পারভেশ ভার্মার বিরুদ্ধে এফআইআর ও গ্রেপ্তারের দাবি ওঠে। সাবেক দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও এএপি নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালও ঘটনাটির সমালোচনা করে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনাটি নিয়ে কংগ্রেস নেতারাও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিজেপির সমালোচনা করেন। তার বক্তব্যে ঘটনাটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে পারভেশ ভার্মার বক্তব্য ও ঘটনার প্রেক্ষাপট সামনে আনা হয়েছে।
এখন পুলিশের অভিযোগ যাচাই এবং রাস্তার নির্মাণমান পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ভিডিওটির সম্পূর্ণ ফুটেজ, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত এগোলে ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট আরও পরিষ্কার হতে পারে। আপাতত প্রকাশ্যে থাকা ভিডিওতে মন্ত্রীকে তরুণের মোবাইল সরিয়ে তাকে চড় মারতে দেখা গেলেও, তার আগে কী ঘটেছিল—সেই অংশ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে আইনি তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করা হয়নি।









