ঢাকার আদালতে হাজিরা শেষে কাশিমপুর কারাগারে ফেরার পথে পুলিশ হেফাজত থেকে ২৫ মামলার আসামি রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’ পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রিজন ভ্যানের চালকসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার কারণ ও দায়িত্বে থাকা সদস্যদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি)।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে জিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আসামি পালানোর ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিভিন্ন পর্যায়ের পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রিজন ভ্যানের চালকও রয়েছেন।
জিএমপি সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার তদন্তে উপপুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর)-এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। আসামিকে আদালতে নেওয়া থেকে শুরু করে কারাগারে ফেরার পথে নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রিজন ভ্যান থামানোর সিদ্ধান্ত, শৌচাগারে নেওয়ার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা এবং আসামি পালানোর সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় থাকবে।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে পরবর্তী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার। ফলে সাময়িক বরখাস্তের পর তদন্তে যে তথ্য উঠে আসবে, তার ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুলিশ ও কারাগার সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজিরার জন্য গাজীপুর থেকে রাজা ওরফে পিচ্চি রাজাকে প্রিজন ভ্যানে করে ঢাকায় নেওয়া হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে বিকেলে তাঁকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।
কারাগারে ফেরার পথে প্রিজন ভ্যানটি গাজীপুরের নাওজোর এলাকায় পৌঁছালে রাজা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার কথা জানান। এরপর দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা ভ্যান থামিয়ে তাঁকে স্থানীয় একটি শৌচাগারে নিয়ে যান। সেখানে যাওয়ার পর কোনো একপর্যায়ে তিনি পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যান।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এর জ্যেষ্ঠ জেল সুপার মো. নজরুল ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে কারাগারে ফেরার সময় নাওজোর এলাকায় শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে রাজা পালিয়ে যান। ঘটনার পরপরই তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তৎপর হন।
আসামি পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়। সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে তাঁকে খুঁজতে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে পালানোর পর তিনি কোন দিকে গেছেন বা বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজা রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হিসেবে পরিচিত। গত ১৯ মে নেপাল থেকে দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাঁকে তাঁর স্ত্রী ও শ্যালকসহ গ্রেপ্তার করে মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনে প্রায় ২৫টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
একাধিক মামলার আসামি একজন বন্দি আদালতে হাজিরা দেওয়ার পর ফেরার পথে কীভাবে পুলিশি হেফাজত থেকে বেরিয়ে গেলেন, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে শৌচাগারে নেওয়ার আগে ও পরে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, আসামির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে কোনো ঘাটতি ছিল কি না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা নির্ধারিত নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে তদন্ত কমিটি।
পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করার পাশাপাশি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দায়িত্বে অবহেলার সুনির্দিষ্ট ধরন বা প্রত্যেক সদস্যের দায় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
জিএমপি জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে পলাতক রাজাকে দ্রুত গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।









