,

বিজ্ঞান ও শিক্ষায় অবদানে অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের ৮৫ বছর

জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, অধ্যবসায় ও শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে যাঁরা নিজেদের জীবনকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি আলোকিত করেন অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. অরুণ কুমার বসাক তাঁদেরই একজন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই বরেণ্য শিক্ষক ও বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চার জগতে একটি শ্রদ্ধেয় নাম।

১৯৪১ সালের ১৭ অক্টোবর পাবনার রাধানগরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আজ ১৭ অক্টোবর ২০২৬, তাঁর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী। জীবনের ৮৫টি বছর পেরিয়ে তিনি প্রবেশ করেছেন ৮৬তম বছরে। দীর্ঘ এই পথচলায় তাঁর শিক্ষাগত সাফল্য, গবেষণার প্রতি নিষ্ঠা এবং শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

শিক্ষাজীবনে অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর

শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছেন ড. অরুণ কুমার বসাক। ১৯৫৭ সালে পাবনার রাধানগর মজুমদার একাডেমি থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন তিনি। এরপর ১৯৫৯ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।

তাঁর এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে উচ্চশিক্ষায়ও। ১৯৬১ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সম্মান পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে।

সেই বছরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা ও গবেষণাজীবন। শিক্ষার্থী হিসেবে অসাধারণ ফল অর্জনের পর শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনেও জ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা

ড. অরুণ কুমার বসাকের জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি হলো উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশযাত্রার সংগ্রাম। ১৯৬৫ সালে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পেলেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের হাতে তাঁর পাসপোর্ট জব্দ হওয়ায় সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

এ বাধা তাঁর উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে নতুন পাসপোর্ট পেয়ে কমনওয়েলথ পোস্টগ্র্যাজুয়েট বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডে যান তিনি। সেখানে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করে ১৯৭৫ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

তাঁর এই অভিজ্ঞতা কেবল একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও লক্ষ্য ধরে রাখার এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধায় উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা ব্যাহত হলেও শেষ পর্যন্ত নিজের অধ্যবসায় ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

শিক্ষকতা, গবেষণা ও সম্মাননা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ কর্মজীবনে ড. অরুণ কুমার বসাক পদার্থবিজ্ঞানের পাঠদান, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর কর্মজীবন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় নিবেদিত শিক্ষকদের অবদানের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে পাঠদান শুধু তত্ত্ব ও সূত্র ব্যাখ্যা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী চিন্তা, যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের দক্ষতা অর্জন করতে হয়। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক এসব গুণ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

ড. বসাক ২০০৮ সালে নিয়মিত শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তবে অবসরের মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক অধ্যায় শেষ হলেও শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চায় তাঁর অবদানের গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রয়েছে।

পদার্থবিজ্ঞানে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৬ সালে তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস গোল্ড মেডেল অর্জন করেন। এই সম্মাননা তাঁর দীর্ঘদিনের বিজ্ঞানসাধনা ও মেধাভিত্তিক অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা

বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও গবেষণার অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন দক্ষ গবেষক, কার্যকর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এমন শিক্ষক, যাঁরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা ও জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শুধু নির্দিষ্ট বিষয়ে পাঠদান করেন না; তাঁরা শিক্ষার্থীদের চিন্তার জগৎ প্রসারিত করেন এবং ভবিষ্যৎ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের গড়ে তুলতে সহায়তা করেন।

ড. অরুণ কুমার বসাকের দীর্ঘ কর্মজীবন এই বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পাবনার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে দেশের অন্যতম প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং যুক্তরাজ্যে পিএইচডি অর্জন—তাঁর পথচলায় রয়েছে অধ্যবসায়, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর নিষ্ঠার পরিচয়।

তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে: সাফল্যের পথে বাধা আসতে পারে, কিন্তু অধ্যবসায় ও লক্ষ্যনিষ্ঠা মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে তাঁর জীবন দেখায়, শিক্ষার প্রকৃত মূল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জনে নয়; সেই জ্ঞানকে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোর মধ্যেও নিহিত।

জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও শুভকামনা

মানুষের জীবনের প্রতিটি বছর অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে। তবে কিছু মানুষের জীবন ব্যক্তিগত অর্জনের সীমা ছাড়িয়ে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. অরুণ কুমার বসাক তেমনই একজন, যাঁর জীবন জ্ঞানসাধনা, প্রতিকূলতা মোকাবিলা এবং শিক্ষকতার প্রতি নিষ্ঠার কথা তুলে ধরে।

তাঁর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বরেণ্য শিক্ষকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা। তাঁর আগামী দিনগুলো সুস্বাস্থ্য, মানসিক প্রশান্তি ও আনন্দে পরিপূর্ণ হোক। তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞানচর্চার প্রতি নিষ্ঠা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও শিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করুক।

শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. অরুণ কুমার বসাক।

আপনার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কর্মময় জীবনের আলো আগামী প্রজন্মের পথচলাকে আরও বহুদিন আলোকিত করুক।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।