এবারের দুর্গাপূজায় মহাসপ্তমীর আচার দুই দিন ধরে পালিত হচ্ছে। আজ প্রথম দিনে সকাল ৭টা ৩৯ মিনিট থেকে ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তমাদি কল্পারম্ভ এবং মহাসপ্তমীবিহিত পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সময় নির্ধারিত হয়েছে। আগামীকাল রোববার মহাসপ্তমীর দ্বিতীয় দিনের আচার পালিত হবে।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গতকাল সকাল থেকেই ষষ্ঠীপূজাকে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। মন্দিরের মেলাঙ্গনে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সামনে বেলগাছের নিচে সকাল ৯টায় শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পূজার জন্য বেলতলা ফুল দিয়ে সাজানো হয়। সেখানে ফলমূল, দই, আমপাতা, বেলপাতা, দূর্বা, ফুলসহ বিভিন্ন উপকরণ রাখা হয়। জ্বালানো হয় প্রদীপ, আর ধূপের ধোঁয়ায় তৈরি হয় ভক্তিময় পরিবেশ।
নির্ধারিত সময়ে পুরোহিতেরা বেলতলায় আসন গ্রহণ করে মন্ত্রপাঠ শুরু করেন। তাঁদের মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে বাজতে থাকে ঢাক, শঙ্খ, ঘণ্টা ও কাঁসর। ভক্তদের উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পূজাস্থল। পূজার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রদীপ ও পাখা হাতে আরতি করেন পুরোহিতেরা। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। এরপর ভক্তদের মধ্যে শান্তির জল ছিটিয়ে দেন তাঁরা।
পরে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দুর্গাপূজা মণ্ডপে উপস্থিত ভক্তরা অঞ্জলি দেন। এ সময় পুরোহিত ধর্মদাস চট্টোপাধ্যায় সবার মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করেন। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, মানুষের জীবন থেকে অমঙ্গল দূর হবে এবং প্রতিটি পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
সন্ধ্যায় দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস
ষষ্ঠীর দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাস। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, এ আচার দেবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূজার জন্য আহ্বান জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এর মধ্য দিয়ে পূজার পরবর্তী আয়োজনগুলো এগিয়ে যায়।
সনাতন ধর্মের শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুসারে, দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে কন্যারূপে মর্ত্যে তাঁর পিতৃগৃহে বেড়াতে আসেন। পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, অসুরশক্তির কাছে পরাজিত হয়ে দেবতারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হলে অশুভ শক্তির বিনাশে তাঁরা সম্মিলিত হন। দেবতাদের তেজরশ্মি থেকে আবির্ভূত হন মহাশক্তি দেবী দুর্গা। তাঁর আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের বার্তা প্রকাশ পায়।
এবারের দুর্গাপূজায় প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং বিদায় নৌকায়। হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে দেবীর আগমন ও গমনের বাহনকে ঘিরে নানা প্রতীকী ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে।
সামনে মহাঅষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী
দুর্গোৎসবের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনগুলোও ঘিরে রয়েছে ভক্তদের প্রস্তুতি। আগামী সোমবার মহাঅষ্টমী, মঙ্গলবার মহানবমী এবং বুধবার বিজয়া দশমী ও দেবী বিসর্জন অনুষ্ঠিত হবে।
মহাঅষ্টমীতে বিশেষ পূজা ও অঞ্জলি দিতে মণ্ডপে সমবেত হন ভক্তরা। মহানবমীতে দেবীর আরাধনা ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালিত হয়। এরপর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব।
বিজয়া দশমী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিদায় ও শুভকামনার দিন। এদিন দেবী দুর্গাকে বিসর্জনের মাধ্যমে কৈলাসে ফিরিয়ে দেওয়ার ধর্মীয় রীতি পালন করা হয়। একই সঙ্গে স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতজনদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। পূজার দিনগুলোতে ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।
সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে পূজা হচ্ছে ২৫৮টি মণ্ডপে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মণ্ডপ সাজানো হয়েছে প্রতিমা, আলোকসজ্জা ও নানা নান্দনিক উপকরণে। পূজার আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে ভক্তদের সমাগম ঘটছে। শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা ও উৎসবের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব।
দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও এর সাংস্কৃতিক আবেদন বাংলাদেশের সামগ্রিক সমাজজীবনেও ছড়িয়ে রয়েছে। পূজাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। উৎসবটি তাই ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বার্তাও বহন করে।
মহাসপ্তমী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলবে দেবী দুর্গার আরাধনা। প্রার্থনা, অঞ্জলি ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে ভক্তরা কামনা করবেন শান্তি, কল্যাণ এবং অশুভ শক্তির বিনাশ। বুধবার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন।









