বান্দরবানে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক বেশি দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা। একই সঙ্গে খালি সিলিন্ডার জমা দিয়ে শুধু গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার নেওয়ার সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে মিলছে না। ফলে প্রয়োজনের তাগিদে গ্রাহকদের গ্যাসের পাশাপাশি নতুন সিলিন্ডারও কিনতে হচ্ছে।
ভোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৫০ টাকা। কিন্তু বান্দরবান শহরে বর্তমানে একই পরিমাণ গ্যাস ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের তুলনায় গ্রাহকদের প্রায় দেড় থেকে পৌনে দুই হাজার টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
সোমবার বান্দরবান শহরের কয়েকটি এলপিজি বিক্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, অনেক দোকানের বাইরে তালা ঝুলছে। তবে কিছু দোকানের ভেতরে আলো জ্বলছিল এবং সেখানে এলপিজি সিলিন্ডারের মজুতও দেখা গেছে। কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলে জানা যায়, দোকান বন্ধ থাকলেও পরিচিত গ্রাহকদের কাছে গ্যাস বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন যেসব পরিবার রান্নার জন্য পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যমপাড়ার বাসিন্দা ইম্মা মারমার পরিবারও এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
ইম্মা জানান, রোববার বিকেলে রান্নার সময় তাদের বাসার গ্যাস শেষ হয়ে যায়। এরপর তার স্বামী বান্দরবান শহরের কয়েকটি দোকানে ফোন করে সিলিন্ডারের খোঁজ করেন। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ীই খালি সিলিন্ডারের বিনিময়ে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার দিতে রাজি হননি।
ব্যবসায়ীরা তাকে জানান, গ্যাস নিতে হলে নতুন সিলিন্ডারও কিনতে হবে। এর জন্য চাওয়া হয় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। গ্যাস না থাকায় ওই পরিবারে রোববার থেকে রান্না হয়নি।
ইম্মা বলেন, তাঁর সাড়ে তিন বছর বয়সী ছেলে এবং সাড়ে সাত মাস বয়সী মেয়ে রয়েছে। রাতে সন্তানদের ঘুম পাড়ানোর আগে তাদের রুটি খেতে দিয়েছেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া আরেক মেয়ে রাতে ও সকালে কিছু না খেয়েই স্কুলে গেছে।
গ্রাহক পরিচয়ে বান্দরবানের কয়েকজন এলপিজি ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে খালি সিলিন্ডার নিয়ে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার দেওয়ার সুযোগ নেই। গ্যাস নিতে হলে গ্রাহককে নতুন সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো বিক্রেতা ৩ হাজার ৫০০ টাকা চাইলেও কেউ কেউ ৩ হাজার ৩০০ টাকায় দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
উজানীপাড়ার এম ও এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব বলেন, এলপিজি নিতে হলে গ্রাহকদের নতুন সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। একটি নতুন সিলিন্ডারের দাম প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। তাঁর দাবি, বসুন্ধরাসহ কয়েকটি কোম্পানির এলপিজির সরবরাহ বর্তমানে নেই।
এভারগ্রিন এন্টারপ্রাইজের অধীনে গ্যাস সরবরাহকারী ওসমান জানান, তাঁদের কাছে বর্তমানে শুধু ইন্ডিপেন্ডেন্টের ‘আই গ্যাস’ রয়েছে। অন্য কোম্পানিগুলোর এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহের এই সীমাবদ্ধতার কারণে খালি সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
বান্দরবানের মতো দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ থাকে। ফলে কোনো একটি পর্যায়ে সরবরাহ ব্যাহত হলে স্থানীয় বাজারে দ্রুত সংকট তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্ধারিত দামের তুলনায় অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগের বিষয়টি ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে যেসব পরিবারে শিশু রয়েছে এবং রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা সীমিত, তাদের জন্য এই সংকট কেবল বাড়তি খরচের বিষয় নয়; দৈনন্দিন খাবার প্রস্তুত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা।









