,

রাবিতে সাংবাদিক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ভিডিওতে ছয় ছাত্রদল নেতা শনাক্ত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের অন্তত ছয় পদধারী নেতার সরাসরি সম্পৃক্ততার দৃশ্য পাওয়া গেছে। একই ঘটনায় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক এক কর্মীকেও একজন সাংবাদিককে মারধর করতে দেখা গেছে। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ভিডিওতে স্পষ্ট হওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলায় কারও নাম উল্লেখ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হামলায় সরাসরি নেতৃত্ব ও অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম হাসিব। আহসান হাবিব আইন বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং হাসিবুল ইসলাম হাসিব ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।

এ ছাড়া ফুটেজে সাংবাদিক নূর এহসান মৃদুলকে লাঠি দিয়ে মারধর করতে দেখা যায় অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী বিশাল চক্রবর্তীকে। হামলায় অংশ নেওয়া অন্যদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রদলের সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, সহসভাপতি তকবীর হাসান ইমন, সহকারী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম সাজু এবং সহকারী দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথি।

শরিফুল ইসলাম নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের, তকবীর হাসান ইমন আইবিএর ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের, সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এবং শাহরিয়ার আলম অথি সংগীত বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।

হামলায় শনাক্ত হওয়া কয়েকজন ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর চাঁদাবাজির অভিযোগে আহসান হাবিব ও হাসিবুল ইসলাম হাসিবকে সংগঠন থেকে প্রথমে সাময়িক এবং পরে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে ঘোষিত নতুন কমিটিতে আহসান হাবিবকে সহসভাপতি এবং হাসিবুল ইসলাম হাসিবকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

এর আগে গত ২৪ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের বুধপাড়া এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে আবারও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর এবং মতিহার থানায় লিখিত অভিযোগ দেন।

অন্যদিকে, তকবীর হাসান ইমন ও সৈয়দ সাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছাত্রলীগের দুই কর্মীকে মারধর, ভয়ভীতি দেখানো এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ১০ হাজার ১০০ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রোববার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ক্ষুব্ধ সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষের কক্ষে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন।

আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে ছিল হামলায় জড়িতদের নাম উল্লেখ করে মামলা করা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব বাতিল, সাবেক শিক্ষার্থীদের সনদ বাতিল, বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ বন্ধ করা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার দায়ে প্রক্টর ও সংশ্লিষ্ট হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ।

পরে উপ-উপাচার্যের আশ্বাসের পর সোমবার শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মনির হোসেন বাদী হয়ে মতিহার থানায় মামলা করেন। তবে মামলায় কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি; আসামিদের অজ্ঞাত হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এ বিষয়ে হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ভিডিওতে হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে ইঙ্গিত থাকলেও আইনি প্রমাণ ছাড়া মামলায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নাম সরাসরি উল্লেখ করা যায় না। তদন্তের মাধ্যমে তাদের সাংগঠনিক পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে তিনি জানান।

হামলার সময় প্রক্টরিয়াল বডির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান ঘটনাটিতে প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে জানান, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও পরিস্থিতির কারণে সরে যান বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে হামলার পর হলের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হলের প্রাধ্যক্ষ। তাঁর দাবি, সংস্কারকাজের কারণে সিসিটিভির সংযোগ আগে থেকেই বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে হামলার সময় কোনো ফুটেজ ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কয়েকজন সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী রয়েছেন।

ঘটনার ভিডিও ফুটেজে হামলাকারীদের কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেলেও মামলায় তাদের নাম না থাকায় তদন্তের স্বচ্ছতা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহি এবং ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এখন তদন্তে ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই পরবর্তী পদক্ষেপের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।