ইউনূস সরকারের সময় সুশীলদের ভূমিকা বিতর্কে

রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশীল সমাজকে সাধারণত নৈতিক দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁদের দায়িত্ব হলো সরকারের নীতিনির্ধারণ ও কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সমালোচনার মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি করা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সুশীল সমাজের একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।

দেশে বিভিন্ন সময়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে সরকার গঠনে সুশীল সমাজের কিছু অংশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে ২০০৭ সাল এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ঘটনা দেখা যায়। দুই সময়ের প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর কার্যক্রম নিয়ে পরবর্তীতে সমালোচনা উঠে আসে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, নীতি নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

২০২৪ সালের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া, বিনিয়োগ কমে যাওয়া, উচ্চ সুদের হার এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির মতো বিষয় সামনে আসে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংঘবদ্ধ সহিংসতার ঘটনাও আলোচনায় আসে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলে। তবে এ সময় সুশীল সমাজের অনেক প্রতিনিধিকে এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি—এমন অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীকালে একই ব্যক্তিদের কেউ কেউ সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেন। জ্বালানি আমদানি, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এতে প্রশ্ন ওঠে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় কেন একই ধরনের সমালোচনা সামনে আনেননি।

মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং আইনের শাসন সম্পর্কেও একই ধরনের আলোচনা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচারবহির্ভূত আটক, প্রাতিষ্ঠানিক বিলম্ব এবং প্রমাণবিহীন অভিযোগের মতো বিষয় নিয়ে সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখা যায় বলে সমালোচনা আছে। অথচ পরবর্তীতে এসব বিষয়েই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ পাওয়া যায়।

নিচের সারণিতে আলোচিত প্রধান বিষয়গুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিস্থিতিপরবর্তী প্রতিক্রিয়া
অর্থনীতিবিনিয়োগ হ্রাস, শিল্পকারখানা বন্ধ, উচ্চ সুদপরবর্তীতে সমালোচনা
আইনশৃঙ্খলাসহিংসতা ও হামলার ঘটনাদেরিতে উদ্বেগ প্রকাশ
মানবাধিকারআটক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাপরবর্তীতে বক্তব্য
দুর্নীতিঅভিযোগ উত্থাপন, তদন্তের প্রশ্নপরে তদন্তের দাবি

সংবিধান সংক্রান্ত বিষয়েও কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয় তখন সামনে আসেনি বলে আলোচনা রয়েছে। এতে সুশীল সমাজের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

তবে সবার অবস্থান এক ছিল না। কিছু সুশীল প্রতিনিধি শুরু থেকেই বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে মতামত দিয়েছেন এবং সমালোচনা করেছেন। তাঁদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে ধারাবাহিক বলে বিবেচিত হয়েছে।

সমগ্র আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশীল সমাজের অংশগ্রহণ থাকলে তাঁদের দায়বদ্ধতা ও ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রত্যাশা আরও বেশি থাকে। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়েই বর্তমানে বিভিন্ন মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।