দেশের বন্ধ ও আংশিক চালু শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সহায়তা, বেসরকারি খাতের কার্যক্রম সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
শনিবার ঢাকার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে গভর্নর ড. মোস্তাফিজুর রহমান এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বা সীমিত পরিসরে পরিচালিত কারখানাগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোই এই কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য।
ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যবহার করা হবে বন্ধ শিল্পকারখানার পুনঃঅর্থায়ন ও পুনরায় চালুর কাজে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই অংশ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।
গভর্নর বলেন, গ্রাহক পর্যায়ে বড় শিল্পের জন্য ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ। তবে ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে সুদের হার তুলনামূলক কিছুটা বেশি হতে পারে। এর মাধ্যমে বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও আর্থিক সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই তহবিল থেকে বৃহৎ শিল্প, কুটির শিল্প, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা সিএমএসএমই খাত এবং কৃষিখাতে অর্থায়ন করা হবে। শিল্প ও কৃষি—উভয় খাতকে সমন্বিতভাবে সক্রিয় করার মাধ্যমে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে আরও জানানো হয়, এই প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু হলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে এবং শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী, এই প্যাকেজের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন সম্প্রসারণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর সুযোগ বাড়লে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। এছাড়া পরিবেশবান্ধব বা সবুজ বিনিয়োগ এবং গ্রিন প্রকল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও এই তহবিল ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করা এবং সৃজনশীল অর্থনীতির সম্প্রসারণও এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন ও ব্যাংকের কাছ থেকে বন্ধ এবং আংশিক চালু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত এক হাজার ২০০টির বেশি শিল্প ইউনিট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় ঋণগ্রহীতাদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, চিহ্নিত শিল্প ইউনিটগুলোর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানির সমস্যা এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। নতুন এই তহবিলের মাধ্যমে সেসব প্রতিষ্ঠানে পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রম চালুর সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও চাহিদা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন ও প্রণোদনামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই বিশেষ তহবিল শিল্পখাতকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
