ক্রীড়া প্রতিবেদক, লাহোর: লাহোরের ঐতিহাসিক গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণী মেগা ফাইনালে পেশোয়ার প্যান্থার্সের বোলারদের বিধ্বংসী তাণ্ডবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে হায়দরাবাদ কিংসম্যানের ব্যাটিং লাইনআপ। টস জিতে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া পেশোয়ারের অধিনায়ক শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। ১৮ ওভারের সংক্ষিপ্ত ঝড়ে মাত্র ১২৯ রানে অল-আউট হয়ে মাঠ ছেড়েছে মার্নাস ল্যাবুশেনের হায়দরাবাদ। নাহিদ রানার গতির ঝাপটা আর অ্যারন হার্ডির বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ের সামনে মধ্যম সারির কোনো ব্যাটারই প্রতিরোধ গড়তে পারেননি।
Table of Contents
আক্রমণাত্মক শুরু এবং দ্রুত পতন
ম্যাচের শুরুটা হায়দরাবাদের জন্য মন্দ ছিল না। ওপেনার মাজ সাদাকাত মাঠে নেমেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের ইঙ্গিত দেন। মাত্র ৬ বলে ২ টি চার ও ১টি ছক্কার সাহায্যে ১১ রান তুলে তিনি দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি করেন। কিন্তু পেশোয়ারের পেস আক্রমণের সামনে তার স্থায়িত্ব ছিল ক্ষণস্থায়ী। দলীয় স্কোরে বড় কোনো ভিত গড়ে দেওয়ার আগেই তিনি সাজঘরে ফেরেন।
দলের অধিনায়ক তথা অস্ট্রেলিয়ান তারকা মার্নাস ল্যাবুশেন অভিজ্ঞতার পরিচয় দিলেও ইনিংস বড় করতে ব্যর্থ হন। ১২ বলে ৩টি চারের মাধ্যমে ২০ রান করে তিনি যখন বিদায় নেন, তখন দলের চাপ বাড়তে শুরু করে। পাওয়ার-প্লে’র ফায়দা তুলে বড় সংগ্রহের যে স্বপ্ন হায়দরাবাদ দেখেছিল, টপ-অর্ডারের এই দ্রুত বিদায়ে তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়।
সাইয়ুম আইয়ুবের নিঃসঙ্গ লড়াই
দলের বিপর্যয়ের মুখে এক প্রান্ত আগলে রেখে অসামান্য দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন তিন নম্বরে নামা সাইয়ুম আইয়ুব। যখন অন্য প্রান্তে ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিল চলছিল, তখন সাইয়ুম লড়াই চালিয়ে গেছেন একাই। ৪২ বলের এক দায়িত্বশীল ইনিংসে তিনি তুলে নেন ব্যক্তিগত অর্ধ-শতক (৫০ রান)। শেষ পর্যন্ত তিনি ৫৪ রানে আউট হলেও দলের সম্মান রক্ষা করতে বড় ভূমিকা পালন করেন।
হায়দরাবাদের ইনিংসের চিত্রটি ছিল এমন যে, একদিকে সাইয়ুম বোলারদের শাসন করার চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে একের পর এক উইকেটের পতন দলের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছিল। মিডল অর্ডারের ব্যর্থতায় তিনি কোনো নির্ভরযোগ্য পার্টনার পাননি, যার ফলে হায়দরাবাদের স্কোরবোর্ড দেড়শ রানের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেনি।
পেশোয়ারের বোলিং তোপ: হার্ডি ও রানার ম্যাজিক
পেশোয়ার প্যান্থার্সের সাফল্যের মূল নায়ক ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিং অলরাউন্ডার অ্যারন হার্ডি। তিনি তার নির্ধারিত স্পেলে অত্যন্ত কিপটে বোলিং করে মাত্র ২৭ রান খরচায় ৪টি মহামূল্যবান উইকেট শিকার করেন। হার্ডির কাটার ও স্লোয়ার ডেলিভারিগুলো হায়দরাবাদের ব্যাটারদের জন্য ছিল দুর্বোধ্য।
অন্যদিকে, তরুণ তুর্কি নাহিদ রানা আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা গতিদানব বলা হয়। ২২ রান দিয়ে তিনি ২টি উইকেট পকেটে পুরেন। বিশেষ করে স্লগ ওভারে তার ইয়র্কার এবং বাউন্সারের মিশ্রণ হায়দরাবাদকে হাত খুলে খেলতেই দেয়নি। এছাড়া মোহাম্মদ বাসিত এবং স্পিনার সুফিয়ান মুকিম একটি করে উইকেট নিয়ে মাঝের ওভারগুলোতে রানের চাকা টেনে ধরেন।
সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড একনজরে
| খেলোয়াড়ের নাম | রান সংখ্যা | বলের সংখ্যা | স্ট্রাইক রেট |
| সাইয়ুম আইয়ুব | ৫৪ | ৪২ | ১২৮.৫৭ |
| মার্নাস ল্যাবুশেন | ২০ | ১২ | ১৬৬.৬৭ |
| মাজ সাদাকাত | ১১ | ০৬ | ১৮৩.৩৩ |
| অতিরিক্ত রান | ১২ | – | – |
| মোট সংগ্রহ | ১২৯ | ১৮ ওভার | ৭.১৬ (রান রেট) |
জয়-পরাজয়ের সমীকরণ ও কৌশল
ফাইনালের মতো স্নায়ুচাপের ম্যাচে ১৩০ রানের লক্ষ্য আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও, লাহোরের পিচে এই রান তাড়া করা সহজ নাও হতে পারে। তবে পেশোয়ার প্যান্থার্সের ব্যাটিং গভীরতা এবং তাদের বর্তমান ফর্ম বিবেচনা করলে তারা ফেভারিট হিসেবেই দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করবে।
হায়দরাবাদ কিংসম্যানের বোলারদের জন্য কাজটা অনেক কঠিন। তাদের জেতার একমাত্র উপায় হলো পাওয়ার-প্লে’র মধ্যে পেশোয়ারের ৩-৪টি উইকেট দ্রুত তুলে নেওয়া। মার্নাস ল্যাবুশেনকে এখন তার বোলারদের ওপরই সম্পূর্ণ ভরসা করতে হচ্ছে। মাঠের পরিস্থিতি বলছে, গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে আজ একটি রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের অপেক্ষা করছে ক্রিকেট প্রেমীরা। ল্যাবুশেনের অধিনায়কত্ব নাকি পেশোয়ারের ব্যাটিং পাওয়ার—শেষ হাসি কে হাসবে, তা সময়ই বলে দেবে।
