মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও জার্মানির কূটনৈতিক অবস্থান: হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক ইস্যু

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে জার্মানির পররাষ্ট্রনীতি একটি নতুন মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল ইরানকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি, যা ইউরোপ তথা সমগ্র বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে বার্লিন মনে করে।

কূটনৈতিক কৌশল ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ প্রসঙ্গ

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন যে, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রোধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রশ্নে জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অভিন্ন। তিনি মার্কিন শীর্ষ রাজনীতিক মার্কো রুবিওর সমসাময়িক বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বলেন, ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়ন থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসতে হবে। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমেই এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এ ছাড়াও, বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করার ওপর তিনি জোর দেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমানে পাকিস্তান সফর করছেন। ইসলামাবাদে এক রাষ্ট্রীয় সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইরানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তেহরানের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অবিলম্বে গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ আলোচনায় বসার সুযোগ গ্রহণ করা। ওয়াডেফুলের মতে, বর্তমান সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সংলাপই একমাত্র যৌক্তিক পথ। ইরানের জনগণের বৃহত্তর স্বার্থ এবং ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করার জন্য তিনি তেহরান প্রশাসনের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান।

আটলান্টিক সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ট্রাম্পের সমালোচনা

ইরান ও ইসরায়েল ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই তাঁর ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। ট্রাম্প ইউরোপের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার কূটনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই তালিকায় রয়েছেন:

  • জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস

  • স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ

  • যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিযোগ, ইরানকে নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় দেশগুলো নমনীয় নীতি অনুসরণ করছে, যা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী। তিনি ন্যাটো জোটকে ইরান ইস্যুতে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জোর দাবি জানান। ট্রাম্প এমনকি এই হুমকিও দিয়েছেন যে, যদি মিত্র রাষ্ট্রগুলো ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত সমর্থন না দেয়, তবে ওয়াশিংটন ন্যাটো জোট থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে পারে। তবে জার্মানি এই চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে তাদের স্বতন্ত্র ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াডেফুল এর আগেই স্পষ্ট করেছিলেন যে, হরমুজ প্রণালির সুরক্ষায় ন্যাটো বা কোনো সামরিক জোটের সরাসরি হস্তক্ষেপ বার্লিন সমর্থন করে না।

চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের কৌশলগত বিশ্লেষণ

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ইরান নীতির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। গত ২৭ এপ্রিল উত্তর রাইন-ওয়েস্টফালিয়ায় এক ছাত্র সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ইরানকে ঘিরে চলমান সংকটে ওয়াশিংটনের কোনো সুনির্দিষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা সংকট থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা নেই। মের্ৎসের গভীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরান কূটনৈতিক দরকষাকষিতে অত্যন্ত কুশলী এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে তাদের প্রভাব পশ্চিমা বিশ্বের অনেক ধারণার চেয়েও বেশি শক্তিশালী।

তিনি যুক্তি দেন যে, শুধুমাত্র কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক ভীতির মাধ্যমে ইরানকে নতজানু করা অসম্ভব। বরং তাদের আঞ্চলিক প্রভাবকে একটি বাস্তব সত্য হিসেবে মেনে নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোতে হবে। জার্মানির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, কৌশলী আলোচনার অভাব এবং অস্পষ্ট অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলছে।

সামরিক নিরপেক্ষতা ও শাসন পরিবর্তনের বিরোধিতা

সম্প্রতি ইরানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর জার্মানি তার সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত কঠোরভাবে স্পষ্ট করেছে। বার্লিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে: ১. জার্মানি ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ বা যুদ্ধে অংশ নেবে না। ২. বাইরের কোনো শক্তির মাধ্যমে ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের অনৈতিক প্রচেষ্টাকে জার্মানি কোনোভাবেই সমর্থন করবে না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াডেফুল তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, জার্মানি অবশ্যই ইরানি জনগণের জন্য একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ কামনা করে, তবে সেই পরিবর্তনের চাবিকাঠি থাকতে হবে দেশটির সাধারণ মানুষের হাতে। কোনো বহিঃশক্তির চাপিয়ে দেওয়া পরিবর্তন টেকসই হয় না এবং তা মধ্যপ্রাচ্যে আরও চরম অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। যদিও বার্লিন ইরানের বর্তমান প্রশাসনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কঠোর সমালোচক এবং বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে, তবুও সার্বভৌম রাষ্ট্রে অনধিকার হস্তক্ষেপের বিষয়ে তারা অত্যন্ত সচেতন।

হরমুজ প্রণালির বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব

হরমুজ প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জীবনীশক্তি। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথটি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ (এক-পঞ্চমাংশ) পরিবাহিত হয়। এই পথে সামান্যতম অস্থিরতা বা বাণিজ্যিক অবরোধের সৃষ্টি হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ দেশ তাদের জ্বালানি আমদানির জন্য এই রুটের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই জার্মানি ইরানের ওপর এই মর্মে চাপ সৃষ্টি করছে যেন তারা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে চলে এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি স্বরূপ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে।