ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ তুলে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে (২৮) চুল কেটে ও গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দুই যুবকসহ কয়েকজন জড়িত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। নির্যাতনের দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি আলোচনায় আসে। পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিও দেখে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে একাধিক দল কাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক সদস্যের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার বিকেলে সদরপুর উপজেলার একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ওই দিন রাতে নির্যাতনের ভিডিও দুটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও দুটির দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ১ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড ও ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড।
ছড়িয়ে পড়া প্রথম ভিডিওতে দেখা যায়, ওই গৃহবধূকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কালো টি-শার্ট পরা এক যুবক তাঁর হাত টেনে ধরে আছেন। এ সময় চেক টি-শার্ট পরা আরেক যুবক কাঁচি দিয়ে তাঁর মাথার চুল এলোমেলোভাবে কেটে দিচ্ছেন। নির্যাতন থেকে বাঁচতে ওই নারীকে চিৎকার করতে শোনা যায়। তবে তাঁর আর্তনাদ সত্ত্বেও চুল কাটার ঘটনা চলতে থাকে।
দ্বিতীয় ভিডিওতে দেখা যায়, রাতে ওই নারী ও এক যুবককে একটি গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাঁদের মারধর করার দৃশ্যও ভিডিওতে রয়েছে। তবে ভিডিও দুটি ধারণের আগে ও পরে কী ঘটেছিল এবং নির্যাতনের ঘটনায় ঠিক কতজন অংশ নিয়েছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে নির্যাতনে জড়িত দুই যুবকের নাম সুমন হোসেন ও জয় হোসেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা ওই প্রবাসীর স্বজন বলে জানা গেছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আটকে রাখার পর নির্যাতন, বাবার বাড়িতে পাঠানোর অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই গৃহবধূ গত শনিবার তাঁর বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আসেন। ওই রাতেই পরিবারের সদস্যরা তাঁর কক্ষ থেকে এক যুবককে আটক করেন। যুবকটি পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজনও তাঁকে ধরে ফেলেন বলে জানা গেছে।
এরপর ওই নারী ও যুবককে আটকে রাখা হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাঁদের দিনভর আটকে রাখার পর রোববার বিকেলে ওই গৃহবধূর চুল কেটে দেওয়া হয়। পরে তাঁকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং আটক যুবককে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঘটনাটির পেছনে কী পরিস্থিতি ছিল, পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা কী এবং নির্যাতনের সময় কারা উপস্থিত ছিলেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগের সত্যতাও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না
সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন শাহ ঘটনাটিকে আইনবিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করেছে।
ওসি বলেন, কেউ অপরাধ করে থাকলে তাঁর বিচারের জন্য আইন রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। তবে তদন্তের অগ্রগতি, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে কি না কিংবা কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ উঠলেও তাঁকে আটকে রাখা, মারধর করা কিংবা অপমানজনক শাস্তি দেওয়ার অধিকার অন্য কারও নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। ব্যক্তিগত বিরোধ বা পারিবারিক ক্ষোভের জেরে কাউকে নির্যাতন করা আইনের শাসনের পরিপন্থী।
বিশেষ করে একজন নারীকে প্রকাশ্যে বা অন্যদের সামনে চুল কেটে অপমান করা, গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা এবং মারধরের মতো আচরণ তাঁর শারীরিক নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ভুক্তভোগীর পরিচয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এ ধরনের ভিডিও প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করা জরুরি।
সদরপুরের এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত বিবরণ উদ্ঘাটন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নির্যাতনের শিকার নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগ তৈরি করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অভিযোগের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে—ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা জনতার শাস্তির মাধ্যমে নয়।









