ডান পায়ের ঊরুর চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরেই আলো ছড়ালেন নেইমার জুনিয়র। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নেমে পেনাল্টি থেকে জোড়া গোল করে সান্তোসকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করলেন ব্রাজিলের এই তারকা ফুটবলার। তাঁর নৈপুণ্যে ব্রাজিলিয়ান সিরি আ-তে ফ্ল্যামেঙ্গোর বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করেছে সান্তোস। দুই গোলের ব্যবধান ঘুচিয়ে এক পয়েন্ট পাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের মাঠে সমর্থকদেরও স্বস্তি দিয়েছে দলটি।
গত ২ সেপ্টেম্বর ডান পায়ের ঊরুতে চোট পেয়েছিলেন নেইমার। এরপর এই ম্যাচ দিয়েই প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফিরলেন তিনি। তবে চোট থেকে সেরে উঠলেও পুরোপুরি ম্যাচ ফিট কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকায় সান্তোসের শুরুর একাদশে জায়গা হয়নি তাঁর। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ফিলিপে কুতিনিওর পরিবর্তে তাঁকে মাঠে নামান কোচ কুকা। তখন পর্যন্ত ম্যাচে ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল ফ্ল্যামেঙ্গো।
প্রথমার্ধে দুই গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল সফরকারী দল। ৪৩ মিনিটে দানিলোর গোলে এগিয়ে যায় ফ্ল্যামেঙ্গো। এরপর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন লুকাস পাকেতা। বিরতির আগে দুই গোল হজম করায় ম্যাচে ফিরতে সান্তোসের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। নেইমার মাঠে নামার পরও শুরুতে কাঙ্ক্ষিত গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারছিল না স্বাগতিকেরা।
তবে ম্যাচের শেষ দিকে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নিজেদের পেনাল্টি বক্সে হ্যান্ডবল করায় ফ্ল্যামেঙ্গোর ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জর্জিনিওর বিরুদ্ধে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। ভিএআরের পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত হয়। এ ঘটনায় জর্জিনিও লাল কার্ডও দেখেন। ফলে ম্যাচের বাকি সময় ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় ফ্ল্যামেঙ্গোকে।
পেনাল্টি নেওয়ার আগে ভিএআরের পর্যালোচনায় সময় লাগে ৯ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড। ২০১৯ সালে ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি প্রযুক্তি চালুর পর এটিই ছিল খেলা বন্ধ থাকার দীর্ঘতম সময়ের রেকর্ড। দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্পটকিক নিতে দাঁড়ান নেইমার। ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে সান্তোসের হয়ে ব্যবধান কমান তিনি।
একজন বেশি খেলোয়াড় নিয়ে মাঠে থাকার সুবিধা কাজে লাগিয়ে এরপর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে সান্তোস। প্রথম পেনাল্টি থেকে গোল পাওয়ার মাত্র চার মিনিট পর আবারও স্পটকিকের সুযোগ পায় দলটি। সান্তোসের ফরোয়ার্ড গ্যাব্রিয়েল বারবোসাকে নিজেদের বক্সে ফাউল করেন ফ্ল্যামেঙ্গোর উইঙ্গার লুইস আরাউহো। রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দিলে আবারও দায়িত্ব নেন নেইমার।
দ্বিতীয়বারও নির্ভুল শটে গোল করেন তিনি। ম্যাচের ৮২ ও ৮৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে করা তাঁর দুই গোলেই সমতায় ফেরে সান্তোস। দুই গোলে এগিয়ে থাকা ফ্ল্যামেঙ্গো শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধান ধরে রাখতে পারেনি। শেষ বাঁশি বাজার সময় স্কোরলাইন ২-২ থাকায় পয়েন্ট ভাগাভাগি করে মাঠ ছাড়ে দুই দল।
চোট থেকে ফিরলেও পুরো ম্যাচে ডান পা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক ছিলেন নেইমার। কর্নার কিক নেননি ডান পায়ে। ফ্রি-কিক নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাঁ পা ব্যবহার করেছেন। তবে পেনাল্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ডান পায়ে শট নিতে দ্বিধা করেননি। দীর্ঘ পাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি এড়িয়ে চলেছেন তিনি।
ম্যাচ শেষে নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে নেইমার বলেন, ‘চোট থেকে ফেরায় (ডান পায়ে) দূরপাল্লার পাস দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইনি।’
অর্থাৎ, মাঠে ফিরেই নিজের স্বাভাবিক খেলায় পুরোপুরি ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে ছন্দ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। চোটের পর প্রথম ম্যাচেই দুই গোল করলেও ডান পায়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। তাঁর এই সতর্কতা ভবিষ্যতে মাঠে নিয়মিত থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ম্যাচে গোলের পাশাপাশি মাঠের উত্তেজনাতেও জড়িয়ে পড়েন নেইমার। ফ্ল্যামেঙ্গোর মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতার সঙ্গে বাদানুবাদে জড়ান তিনি। মাঠে নামার প্রায় ১০ মিনিট পর রেফারির সঙ্গেও তর্কে জড়িয়ে হলুদ কার্ড দেখেন। তবে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছেন তিনি।
দুই দলের পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন নেইমার। তাঁর মতে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উভয় দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘দারুণ ফল। দুই দলের জন্যই ম্যাচটা দারুণ ছিল, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একে অপরকে আক্রমণ করে গেছে। আমার মনে হয় ব্রাজিলে এ দুটো দলই সেরা।’
এই ড্রয়ের ফলে দুই দলের টানা জয়ের ধারায় ছেদ পড়েছে। ম্যাচের আগে সান্তোস টানা সাতটি ম্যাচে জয় পেয়েছিল, আর ফ্ল্যামেঙ্গো জিতেছিল টানা পাঁচ ম্যাচে। ফলে উভয় দলই নিজেদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল। কিন্তু নেইমারের শেষ দিকের দুই গোল সেই হিসাব বদলে দেয়।
ব্রাজিলিয়ান সিরি আ-র পয়েন্ট তালিকায় ২৯ ম্যাচে ৬১ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ফ্ল্যামেঙ্গো। একই সংখ্যক ম্যাচ খেলে ৪২ পয়েন্ট নিয়ে অষ্টম স্থানে রয়েছে সান্তোস। আগামী বছর দক্ষিণ আমেরিকার শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতা কোপা লিবার্তোদোরেসে খেলার যোগ্যতা অর্জনের লড়াইয়ে রয়েছে দলটি।
সান্তোসের জন্য এই এক পয়েন্ট তাই গুরুত্বপূর্ণ। আর নেইমারের জন্য ম্যাচটি চোট কাটিয়ে ফেরার পর নিজের সামর্থ্য জানান দেওয়ার সুযোগ। দলকে জয় এনে দিতে না পারলেও দুই গোল করে পরাজয় এড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তবে সামনে নিয়মিত খেলতে হলে তাঁকে শারীরিক সক্ষমতা ও চোটের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এগোতে হবে।









