,

ম্যারাডোনার মৃত্যুতে চিকিৎসকদের ১২ বছরের কারাদণ্ড দাবি

আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর চিকিৎসায় নিয়োজিত মেডিক্যাল টিমের সদস্যদের সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড দাবি করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। বৃহস্পতিবার আদালতে চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় তাঁরা এ দাবি জানান। চিকিৎসায় অবহেলা, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে এ বিচার চলছে।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ম্যারাডোনা ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর মারা যান। মৃত্যুর আগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় থাকা অবস্থায় ৬০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। বুয়েনস এইরেসের শহরতলি তিগ্রেতে একটি ভাড়া বাসায় হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা ও অ্যাকিউট পালমোনারি এডেমায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। এডেমা হলো শরীরের টিস্যুতে অতিরিক্ত তরল জমে যাওয়া; ফুসফুসে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শ্বাসপ্রশ্বাস গুরুতরভাবে ব্যাহত হতে পারে।

মামলার কেন্দ্রীয় অভিযোগ, হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে না রেখে ম্যারাডোনাকে বাসায় রেখে চিকিৎসা চালানোর সিদ্ধান্ত এবং তাঁর মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত না করার কারণে তাঁর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। তবে অভিযুক্ত চিকিৎসাকর্মীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, ম্যারাডোনার মৃত্যু ছিল অপ্রত্যাশিত এবং তাঁরা নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন।

‘বিশৃঙ্খল চিকিৎসাব্যবস্থায় সহায়হীন হয়ে পড়েছিলেন ম্যারাডোনা’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্যাট্রিসিও ফেরাই চূড়ান্ত যুক্তিতর্কে অভিযোগ করেন, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা ম্যারাডোনাকে কার্যত অসহায় অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুসরণ করেননি এবং রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন।

ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক লিওপোল্ড লুকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর শাস্তির আবেদন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। তাঁর জন্য সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনস্তত্ত্ববিদ, নার্স ও চিকিৎসাসেবার সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিসহ অন্য অভিযুক্তদের জন্য চার থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ডের আবেদন করা হয়েছে।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ‘ডোলো ইভেঞ্চুয়াল’ নীতির আওতায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এই আইনি ধারণার অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তি নিজের আচরণ বা নিষ্ক্রিয়তার ফলে গুরুতর পরিণতি ঘটতে পারে—এমন সম্ভাবনা জেনেও সেই আচরণ চালিয়ে যান। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে।

বাসায় ছিল না জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম

মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ম্যারাডোনার শারীরিক অবস্থার অবনতি সত্ত্বেও তাঁকে হাসপাতালে না রেখে বাসায় চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত যথাযথ ছিল কি না। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, তাঁর জন্য নির্ধারিত বাসায় জরুরি চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত ছিল না।

আইনজীবীরা আদালতে উল্লেখ করেন, সেখানে হাসপাতালের উপযোগী বিছানা, ডিফিব্রিলেটর, অ্যাম্বুলেন্স কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবস্থা ছিল না। ডিফিব্রিলেটর এমন একটি যন্ত্র, যা নির্দিষ্ট ধরনের প্রাণঘাতী হৃদ্‌স্পন্দনের সমস্যা দেখা দিলে বৈদ্যুতিক শকের মাধ্যমে হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে।

আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া কয়েকজন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে ম্যারাডোনার শরীরে একাধিক বিপজ্জনক উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল শরীরে অতিরিক্ত তরল জমার লক্ষণ, দ্রুত হৃৎস্পন্দন বা ট্যাকিকার্ডিয়া এবং শ্বাসকষ্ট। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, এসব লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও চিকিৎসকেরা সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি।

রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী আইনজীবী কোসমে ইরিবারেন আদালতে বলেন, ম্যারাডোনার মৃত্যু হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা ছিল না; বরং তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতির লক্ষণ আগে থেকেই প্রকাশ পাচ্ছিল। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর মামলার বিচারিক মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।

আদালতে প্রদর্শিত হয় ম্যারাডোনার মৃত্যুর পরের ছবি

বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত যুক্তিতর্কের শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ম্যারাডোনার মরদেহের কয়েকটি ছবি আদালতে প্রদর্শন করেন। ছবিগুলোতে তাঁর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকতে দেখা যায়। আদালতে উপস্থিত তাঁর মেয়েরা ছবিগুলো দেখতে না পেয়ে মুখ ঢেকে রাখেন। ঘটনাটি মামলার আবেগঘন ও সংবেদনশীল দিকটি সামনে নিয়ে আসে।

ম্যারাডোনা দীর্ঘদিন মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত সমস্যার সঙ্গে লড়াই করেছেন। তবে তাঁর অতীতের স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুর আগে তাঁর চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব কীভাবে পালন করা হয়েছিল, সেটিই এই মামলার প্রধান বিচার্য বিষয়।

চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত দায় এড়িয়ে গেছেন। তাঁদের অবস্থান, ম্যারাডোনার মৃত্যুর জন্য তাঁদের চিকিৎসাসেবাকে দায়ী করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থার যথাযথ মূল্যায়ন করেননি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন।

আগের বিচার বাতিলের পর নতুন করে আইনি প্রক্রিয়া

ম্যারাডোনার মৃত্যুর ঘটনায় এর আগে শুরু হওয়া বিচারপ্রক্রিয়া গত বছর বাতিল হয়ে যায়। প্রায় আড়াই মাস ধরে চলা সেই বিচার বাতিলের কারণ ছিল, বিচারকদের একজন মামলাটি নিয়ে নির্মিত একটি গোপন প্রামাণ্যচিত্রে অংশ নিয়েছিলেন। বিচারিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় আগের প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।

এরপর নতুন করে বিচার শুরু হয়। গত এপ্রিল থেকে সাতজন চিকিৎসাকর্মীর বিরুদ্ধে চলা এই মামলায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব পালনের ধরন এবং মৃত্যুর আগে ম্যারাডোনার শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হচ্ছে।

ধারণা করা হচ্ছে, চূড়ান্ত যুক্তিতর্কের এই পর্ব শেষ হতে প্রায় দুই সপ্তাহ লাগতে পারে। এরপর আদালত রায় ঘোষণা করবেন। রায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয় কি না, তা নির্ধারণ করা হবে।

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত ও প্রতিভাবান খেলোয়াড় ম্যারাডোনার মৃত্যু শুধু তাঁর ভক্তদের মধ্যে শোক তৈরি করেনি, বরং সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসা, চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ব এবং বাসায় চিকিৎসাসেবার নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। আদালতের রায় এসব প্রশ্নের আইনি নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।