জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

নিরাপত্তাহীন গাজীপুর, হত্যা-ছিনতাই-চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ জনজীবন

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, মাদক কারবার ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। তৈরি পোশাক, ওষুধ, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় সমৃদ্ধ এই জেলায় মহাসড়ক থেকে আবাসিক এলাকার অলিগলি—বিভিন্ন জায়গায় অপরাধের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অনেক বাসিন্দাই স্বাভাবিক চলাচলে আতঙ্ক বোধ করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঝুট ব্যবসা, পরিবহন, শ্রমিক নিয়োগ, মাদক কারবার এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। কেউ কেউ হামলা, চাঁদাবাজি বা ছিনতাইয়ের শিকার হলেও ঝামেলা বাড়ার আশঙ্কায় থানায় অভিযোগ করতে আগ্রহ দেখান না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রায় দুই মাস আগে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হন পশ্চিম জয়দেবপুরের মেডিকেল শিক্ষার্থী মাইশা ফৌজিয়া সৃজনী। এ সময় তাঁর কানের স্বর্ণের দুল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন সড়কে চলাচলের সময় আতঙ্ক কাজ করছে বলে জানান তিনি।

মাইশা বলেন, “অনেক সড়ক এখন ছিনতাইকারীদের কারণে অনিরাপদ মনে হয়। পুলিশের পাশাপাশি সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারে।”

কালিয়াকৈরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিমের অভিযোগ, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁকে হামলার শিকার হতে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাঁর কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে অতর্কিতভাবে হামলা করা হয় এবং এতে তিনি রক্তাক্ত জখম হন।

একের পর এক গুরুতর অপরাধ

চলতি বছরের ৯ মে কাপাসিয়ার রাউৎকোনায় একই পরিবারের দুই শিশুসহ পাঁচজনকে হত্যার ঘটনা গাজীপুরের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত অপরাধ। এর পরদিন কালিয়াকৈরের বাগচালা এলাকায় গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া গাছা এলাকায় এক অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যার ঘটনাসহ জেলার বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়ক থেকে প্রায়ই মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৯ এপ্রিল টঙ্গীর কেরানীরটেক এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশের ওপর হামলায় চার পুলিশ সদস্যসহ পাঁচজন আহত হন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের গাজীপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা না হলে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়তে পারে। আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

টঙ্গীর বাসিন্দা রিয়াজ হাসানের মতে, গাজীপুরে অপরাধের অন্যতম বড় কারণ মাদক। তাঁর ভাষ্য, মাদকের সঙ্গে জড়িতদের কারণে হত্যা, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ বাড়ছে। সন্ধ্যার পর নিরাপদে চলাচল নিয়েও মানুষের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষক মিয়াজ উদ্দিন চাঁদাবাজির প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও কার্যকর ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ী জায়েদুল হামিদ বলেন, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে শিল্প ও বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গাজীপুর জজকোর্টের আইনজীবী সিরাজুল ইসলামও সন্ধ্যার পর মহাসড়ক, শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

হত্যার মামলায় ওঠানামা

গাজীপুর মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মহানগর এলাকায় ২০২১ সালে ৫৫টি হত্যা মামলা হয়েছিল। ২০২২ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৭টিতে। ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয় ৯৪টি এবং ২০২৪ সালে ৯৬টি। ২০২৫ সালে হত্যা মামলা কিছুটা কমে ৮১টিতে নামে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত মহানগরে ২৭টি হত্যা মামলা হয়েছে।

অন্যদিকে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচ থানায় ২০২১ সালে ২৭টি, ২০২২ সালে ৩৪টি, ২০২৩ সালে ৪৩টি, ২০২৪ সালে ৩৭টি এবং ২০২৫ সালে ৩২টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা ১৮টি।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগেও অস্বাভাবিক মৃত্যুর বড়সংখ্যক মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য এসেছে। ২০২১ সালে ৬৮৫টি মরদেহ, ২০২২ সালে ৬৩৪টি, ২০২৩ সালে ৬৬৫টি, ২০২৪ সালে ৭৮০টি এবং ২০২৫ সালে ৮৩০টি মরদেহ সেখানে ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। চলতি বছরের ৯ জুলাই পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ৫৩৫টি।

এসব মরদেহের মধ্যে হত্যা, আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে। ফলে শুধু হত্যা মামলার পরিসংখ্যান দিয়ে জেলার সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, গাজীপুরে অপরাধ আগের তুলনায় কমেছে। তাঁদের দাবি, জেলার শিল্প ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অপরাধীরা এখানে এসে আত্মগোপন করে। কেউ কেউ মাদক, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে আবার অপরাধ সংঘটনের পর অন্যত্র চলে যায়।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, আগের বছরের তুলনায় চলতি বছরে মহানগর এলাকায় হত্যাকাণ্ড কমেছে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

তিনি বলেন, হত্যা ছাড়াও ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জেলা পুলিশ সুপার মো. শরীফ উদ্দীন জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশ কাজ করছে। সংঘটিত অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশি টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বলে জানিয়েছেন।

তবে পুলিশের এই আশ্বাসের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, অপরাধ দমনে শুধু ঘটনার পর অভিযান নয়—ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। শিল্পাঞ্চল হিসেবে গাজীপুরের অর্থনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে জননিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর