নারীমুক্তির শতবর্ষ ও আজকের বাংলাদেশ হোসনেআরা জেমী

নারীমুক্তির শতবর্ষ ও আজকের বাংলাদেশ

হোসনেআরা জেমী

শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ভূখণ্ডে নারীমুক্তির যে ধারা প্রবাহিত হয়েছে, তা কেবল কিছু নাম বা ঘটনার ইতিহাস নয়—এটি বাঙালি সমাজের আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম।
যখন ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের সন্ধিক্ষণে নারীশিক্ষা ছিল প্রায় নিষিদ্ধ, তখন কলমকে অস্ত্র করে দাঁড়িয়েছিলেন বেগম রোকেয়া। তাঁর সুলতানার স্বপ্ন কেবল কল্পকাহিনি ছিল না; ছিল এক দৃষ্টিভঙ্গির বিপ্লব।
ব্রিটিশবিরোধী ও সামন্তবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতন সয়েও আপসহীন ছিলেন ইলা মিত্র।
অস্ত্র হাতে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।
এই ধারার পরবর্তী অধ্যায়ে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম—সব জায়গাতেই নারীর উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠে নানা নারীসংগঠন, যেমন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, যারা আইনি সংস্কার, পারিবারিক আইন, সহিংসতা প্রতিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—এসব বিষয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে এসেছে।
তাহলে প্রশ্ন: এত অর্জনের পরও আজ সংশয় কেন?
আজকের বাংলাদেশে আমরা এক দ্বৈত বাস্তবতা দেখি।
একদিকে—
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের ভর্তির হার ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ।
তৈরি পোশাক শিল্প থেকে প্রশাসন, ব্যাংকিং, শিক্ষা, সেনাবাহিনী—সবখানে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।
স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত আসন নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে নারীরা সরব, সংগঠিত ও প্রতিবাদী।
অন্যদিকে—
অনলাইন ও অফলাইনে নারীবিদ্বেষী ভাষা ও সহিংসতা বাড়ছে।
ধর্মীয় বা রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তির উত্থান দৃশ্যমান।
কিছু শিক্ষিত নারীও পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে “স্বাভাবিক” বা “ধর্মসম্মত” বলে সমর্থন করেন।
এই দ্বন্দ্ব কি নারীমুক্তির ব্যর্থতা?
সংগ্রাম সরলরেখায় এগোয় না
ইতিহাস বলছে, কোনো সামাজিক অগ্রগতি কখনো একমুখী হয় না।
নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়লে পারিবারিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলায়। এই পরিবর্তন অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। ফলে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা কেবল পুরুষের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার ভেতর গভীরভাবে প্রোথিত। অনেক নারী সেই কাঠামোর ভেতরেই নিরাপত্তা, মর্যাদা বা পরিচয় খুঁজে পান।
শিক্ষা যদি সমালোচনামূলক চিন্তা না শেখায়, তবে ডিগ্রি থাকলেও মুক্তচিন্তা বিকশিত নাও হতে পারে। ফলে রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান কেবল শিক্ষার পরিমাণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
অর্জন কি তবে অস্বীকারযোগ্য?
না।
আজকের বাংলাদেশে—
মেয়েদের গড় আয়ু বেড়েছে।
মাতৃমৃত্যু কমেছে।
মেয়েরা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে প্রতিনিধিত্ব করছে।
উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই অর্জনগুলো ইতিহাসের পাতায় নয়—বাস্তব জীবনে দৃশ্যমান।
কিন্তু একই সঙ্গে সহিংসতা, বৈষম্য, বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা—এসবও বাস্তব। অর্থাৎ দেশ একই সঙ্গে আলো ও অন্ধকারের বাহক।
সমস্যার মূল কোথায়?
সম্ভবত সমস্যাটি আন্দোলনের অস্তিত্বে নয়, ধারাবাহিকতায়।
প্রশ্নগুলো হতে পারে—
আন্দোলন কি নতুন প্রজন্মের ভাষায় কথা বলছে?
গ্রামীণ ও শহুরে বাস্তবতার ফারাক কি যথেষ্টভাবে বোঝা হচ্ছে?
ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সংলাপ তৈরি না করে কি কেবল বিরোধিতা করা হচ্ছে?
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা ছাড়া কি কেবল আদর্শ দিয়ে মুক্তি টেকসই হয়?
সামনে পথ
বাংলাদেশ কোনো একরঙা বাস্তবতা নয়। এটি একই সঙ্গে অগ্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার, প্রতিবাদ ও আপসের দেশ।
শত বছরের আন্দোলন যদি আজ প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়, সেটি ব্যর্থতার নয়—বরং জীবন্ত থাকার প্রমাণ। কারণ যে সংগ্রাম মৃত, তাকে কেউ প্রশ্ন করে না।
এখন প্রয়োজন—
আত্মসমালোচনা
শিক্ষায় সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা
নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার বিস্তার
সামাজিক ও ধর্মীয় পরিসরে সংলাপ
নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ
মুক্তির ইতিহাস কখনো একদিনে লেখা শেষ হয় না।
রোকেয়ার সময় যেমন লড়াই ছিল, আজও আছে। পার্থক্য শুধু কৌশলে।
প্রশ্ন একটাই—
আমরা কোন শক্তিকে শক্তিশালী করতে চাই?
কারণ অর্জন রক্ষা না করলে হারিয়ে যায়। আর সংগ্রাম থেমে গেলে ইতিহাস পিছিয়ে পড়ে।
লেখক: প্রবাসী কবি, লেখিকা ও সমাজসেবী।