পশ্চিমবঙ্গের চলমান ভোটার তালিকা সংশোধন বা ‘এসআইআর’ (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া চরম অস্থিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন আতঙ্ক ছড়িয়েছে যে, রাজ্যে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৪ জন ব্যক্তি আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১১০ ছাড়িয়ে গেছে উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ভারতীয় নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্র সরকারকে দায়ী করেছেন।
Table of Contents
রেড রোডে নেতাজির মঞ্চ থেকে আক্রমণ
শনিবার (২৪ জানুয়ারি, ২০২৬) কলকাতার রেড রোডে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিস্ফোরক অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের রাজ্যে ১১০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণ গেছে কেবল এই নাগরিকত্ব প্রমাণের দুশ্চিন্তায়। প্রতিদিন তিন-চারজন মানুষ নিজের জীবন শেষ করে দিচ্ছেন, আর ৪০-৪৫ জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরেও কেন সাধারণ মানুষকে বারবার নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে?
ভোটার তালিকা সংশোধন ও বাঙালির পদবি বিতর্ক
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের ৭.৬ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ১.৬৬ কোটি মানুষকে নথি যাচাইয়ের জন্য ডাকা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, এই প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত অসংগতি রয়েছে। বিশেষ করে বাঙালিদের নাম ও পদবির বানান ভিন্নভাবে লেখার বিষয়টি বিবেচনা না করেই ১.৩৮ কোটি মানুষকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
এসআইআর প্রক্রিয়া ও জনজীবনে এর প্রভাব:
| বিষয়ের বিবরণ | পরিসংখ্যান ও তথ্যাবলি |
| মোট ভোটার সংখ্যা | ৭.৬ কোটি। |
| নথি যাচাইয়ের নোটিশ পেয়েছেন | ১.৬৬ কোটি মানুষ। |
| খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া নাম | ৫৮ লক্ষ ভোটার। |
| বিতর্কিত নোটিশের সংখ্যা | ১.৩৮ কোটি। |
| উদ্বেগজনিত মোট মৃত্যু | ১১০ জনেরও বেশি। |
| হাসপাতালে চিকিৎসাধীন | ৪০-৪৫ জন। |
বিশিষ্টজনদের হেনস্তা ও ইতিহাসের বিকৃতি
মুখ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেবল সাধারণ মানুষই নয়, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও এই প্রক্রিয়ায় নোটিশ পাঠিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, “আজ যদি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো তাঁকেও নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য শুনানিতে তলব করা হতো।” তিনি অভিযোগ করেন যে, বিজেপি-নেতৃত্বাধীন কেন্দ্র সরকার দেশের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত করছে এবং মহাত্মা গান্ধী ও বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীদের আদর্শকে অপমান করছে।
রাজনৈতিক লড়াই ও কৌরব-পাণ্ডব তুলনা
বিজেপিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিস্থিতিকে মহাভারতের কৌরব ও পাণ্ডবদের লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা এই অশুভ কৌরব শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছি। তাঁরা টেলিপ্রম্পটার দেখে বাংলা বলার চেষ্টা করে বাংলার বুদ্ধিজীবীদের অপমান করছেন।” তিনি দাবি করেন যে, গেরুয়া ব্রিগেড দেশের আইকনদের স্বপ্ন চুরি করে মানুষের ওপর নিজেদের তৈরি ভ্রান্ত ইতিহাস চাপিয়ে দিতে চাইছে।
উপসংহার
নাগরিকত্ব প্রমাণের নামে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, তাকে গণতন্ত্রের জন্য এক অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, আইনি প্রক্রিয়ার নামে সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই জটিলতা ও প্রাণহানির ঘটনা আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
